টেকনাফের নাফ নদ ও সংলগ্ন সীমান্ত এলাকাগুলোকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি চোরাচালানি চক্রের তৎপরতা আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করেছে। সুগভীর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এই সীমান্ত রুট দিয়ে এখন কেবল প্রাণঘাতী মাদকই আসছে না, বরং তার সাথে দেদারসে ঢুকছে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ। সম্প্রতি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ধারাবাহিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ (আইস) এবং যুদ্ধের স্বয়ংক্রিয় রাইফেল জব্দ হওয়ার পর সীমান্ত সুরক্ষায় নতুন করে বড় উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ের বাহকেরা নিয়মিত ধরা পড়লেও পর্দার আড়ালে থাকা প্রভাবশালী গডফাদারেরা বরাবরই অধরা থেকে যাচ্ছে।
বিজিবি ঢাকা সদর দপ্তর ও টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২-বিজিবি) সূত্রে জানা গেছে, গত ২রা জুলাই গভীর রাতে ডেইলপাড়া-মুন্ডার ডেইল সড়ক দিয়ে মাদক ও অস্ত্রের একটি বড় চালান পাচারের গোপন সংবাদ পায় বিজিবি। এই তথ্যের ভিত্তিতে ভোর ৪টার দিকে মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন এলাকায় একটি সন্দেহভাজন ইজিবাইককে থামার সংকেত দেয় বিজিবির বিশেষ টিম। বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে চোরাকারবারিরা বাহনটি ফেলে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে পরিত্যক্ত ইজিবাইকটি তল্লাশি করে চালকের আসনের নিচ থেকে ২ কেজি ক্রিস্টাল মেথ (আইস) উদ্ধার করা হয়। এরপর ইজিবাইকের ছাদে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে রাখা অবস্থায় একটি স্বয়ংক্রিয় জি-৩ রাইফেল, ১টি দেশীয় তৈরি এলজি, ১টি ম্যাগাজিন এবং ১৩ রাউন্ড তাজা গুলি জব্দ করা হয়। জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে এমন যুদ্ধের অস্ত্র উদ্ধার সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর ঠিক একদিন আগে, ১লা জুলাই রাতে নাফ নদে জেলে ও সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশ ধারণ করে বড় দুটি মাদক চোরাচালানের চেষ্টা নস্যাৎ করে দেয় বিজিবি। শাহপরীর দ্বীপ জেটির দক্ষিণে মিয়ানমার সীমান্ত থেকে আসা একটি সন্দেহভাজন নৌকা ধাওয়া করার পর এক ব্যক্তিকে প্লাস্টিকের বস্তা পিঠে বেঁধে সাঁতরে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে দেখা যায়। বিজিবি সদস্যরা তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে জাগীর হোসেন নামের ওই সাঁতারুকে আটক করে এবং তার বস্তা থেকে ১ লাখ ২০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। একই রাতে নাজিরপাড়ার একটি মাছের ঘেরে জেলের ছদ্মবেশে ঠেলা জাল নিয়ে অনুপ্রবেশকালে আজিজুল হক নামে আরেক চোরাকারবারিকে ১ লাখ ৭০ হাজার পিস ইয়াবাসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করে বিজিবি, যদিও তার সাথে থাকা অপর দুজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
সীমান্তের এই বেপরোয়া পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবির তৎপরতা প্রসঙ্গে টেকনাফ ব্যাটালিয়নের (২ বিজিবি) অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মোঃ হানিফুর রহমান ভূঁইয়া জানান, সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি মাদক, অস্ত্র ও গোলাবারুদ চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি সর্বদা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অপরাধ দমনে টেকনাফ ব্যাটালিয়নের গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন, শাহপরীরদ্বীপ থানা থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে দুর্গম সীমান্তে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে বিজিবি কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে।
সীমান্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকনাফের দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানকে পুঁজি করে যারা ঢাকা ও আন্তর্জাতিক মহলে বসে এই নেটওয়ার্কের সুতা নাড়াচ্ছে, তাদের কালো ছায়া ও মূল শিকড় উপড়ে ফেলা না গেলে কেবল মাঠপর্যায়ের বাহকদের গ্রেফতার করে এই স্রোত ঠেকানো অসম্ভব। দেশের সার্বভৌমত্ব ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এই চোরাচালানের নেপথ্যের গডফাদারদের দ্রুত আইনের আওতায় আনাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
তথ্যসূত্র: সংবাদ