সময়ের চাকা যে কত দ্রুত এবং অভাবনীয়ভাবে ঘুরতে পারে, তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে রইল মঙ্গলবার বিকেলের ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণ। ২০০৭ সালের এক-এগারোর পটপরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারিগর এবং সে সময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে এবার মানবপাচার ও বিপুল অর্থ আত্মসাতের মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। একসময় যার ইশারায় দেশের বাঘা বাঘা রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের ভাগ্য নির্ধারিত হতো, সেই সাবেক সংসদ সদস্যকে কড়া পুলিশি পাহারায় আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হলো। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনায়েদ উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে এই রিমান্ডের আদেশ প্রদান করেন।
আদালতের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী অত্যন্ত আবেগপূর্ণ এবং চাঞ্চল্যকর কিছু অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি আদালতকে মনে করিয়ে দেন এক-এগারোর সেই অন্ধকার দিনগুলোর কথা, যখন এই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন মিলে তথাকথিত ‘ট্রুথ কমিশন’ গঠন করেছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি অনুযায়ী, সেই কমিশনের নামে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের ধরে এনে নির্মম নির্যাতন করা হতো এবং পরে ক্ষমা করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হতো। রাজনৈতিক নেতাদের ওপরও চলত অবর্ণনীয় নিপীড়ন। আইনজীবী ফারুকী কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, সে সময় মাইনাস টু ফর্মুলার নামে জিয়া পরিবারকে চিরতরে রাজনীতি থেকে মুছে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্র হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের এক চরম এবং নির্মম পরিহাস হলো, সেদিন এই চক্রটি যাকে অমানুষিক নির্যাতন করে হত্যা করতে চেয়েছিল, তিনিই আজ এ দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন।
বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির নামে এই সাবেক সেনা কর্মকর্তা প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতকে অবহিত করে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের ভাগ কারা পেয়েছে এবং কোথায় সেই টাকা পাচার করা হয়েছে, তার মূল রহস্য উদ্ঘাটনের জন্যই আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন তারা। এদিন বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ডিবি পুলিশের একটি মাইক্রোবাসে করে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে সিএমএম আদালতে আনা হয়। তাকে এজলাসে তোলার সময় আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং তাকে উদ্দেশ্য করে নানা ধরনের কটু কথা ও স্লোগান দিতে থাকেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপ-পরিদর্শক রায়হানুর রহমান আদালতে আসামির পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করার পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে পুলিশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাই এই মানবপাচার চক্রের মূল হোতাদের চিহ্নিত করা, পলাতক অন্যান্য আসামিদের আইনের আওতায় আনা এবং আত্মসাৎ করা হাজার হাজার কোটি টাকা উদ্ধারের স্বার্থে তাকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে গভীরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা একান্ত প্রয়োজন। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহীন এই রিমান্ড বাতিল চেয়ে আসামির জামিনের আবেদন করলেও, অপরাধের মাত্রা এবং রাষ্ট্রপক্ষের জোরালো যুক্তির মুখে আদালত তা সরাসরি নামঞ্জুর করে দেন।
এই চাঞ্চল্যকর মামলাটির প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর। আফিয়া ওভারসিজ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আলতাব খান রাজধানীর পল্টন থানায় এই মামলাটি দায়ের করেছিলেন। মামলায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছাড়াও সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমেদ, সাবেক সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন, এম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের এমডি এবং ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের রুহুল আমীন স্বপনসহ মোট ১০৩ জনকে আসামি করা হয়। মামলার এজাহারে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশে জনশক্তি রপ্তানির জন্য দুই হাজারের বেশি বৈধ রিক্রুটিং এজেন্ট থাকলেও, এই আসামিরা নিজেদের মধ্যে একটি শক্তিশালী মাফিয়া সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন।
এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তারা সাধারণ ব্যবসায়ীদের চরম বৈষম্যের শিকার বানান। তৎকালীন সচিব তার নিজ সন্তানকে এই অপরাধ চক্রের সদস্য হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন এবং সাবেক মন্ত্রী তার এক আত্মীয়কে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ‘প্রবাসী অ্যাপস’ নিয়ন্ত্রণের অনুমতি দিয়ে এই মাফিয়া চক্রকে সরাসরি মদদ জুগিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আসামিরা পরস্পর যোগসাজশ করে সাধারণ কর্মীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে জনপ্রতি দেড় লাখ টাকা করে ৮৪১ জনের কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা জোরপূর্বক চাঁদা হিসেবে আদায় করেন। এর বাইরেও দেশজুড়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে সংঘবদ্ধভাবে তারা প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা চাঁদা তুলে আত্মসাৎ করেছেন, যার জবাবদিহি করতেই আজ একসময়ের এই দাপুটে কর্মকর্তাকে রিমান্ডের মুখোমুখি হতে হলো।