উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) করপোরেট প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতেই বহাল থাকবে নাকি বগুড়ায় স্থানান্তরিত হবে—এই প্রশ্নে এক অভূতপূর্ব আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন সরকারের দুই মন্ত্রী। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কোনো পদে না থাকা সত্ত্বেও স্থান নির্ধারণের এই প্রশ্নে স্ব স্ব জেলার প্রশাসনিক স্বার্থ রক্ষায় সোচ্চার হয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং ভূমিমন্ত্রী ও রাজশাহী-২ আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিনু। কৌশলগত যুক্তি ও প্রশাসনিক দক্ষতার চেয়ে ব্যক্তিগত বাকযুদ্ধে রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠায় অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ গ্রাহক মহল চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
ঘটনার সূত্রপাত হয় বগুড়া থেকে নির্বাচিত প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দেওয়া একটি আধা সরকারি পত্র বা ডিও লেটারকে কেন্দ্র করে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ওই পত্রে তিনি জোর দাবি জানান যে, নেসকোর হেড অফিস বগুড়ায় স্থানান্তর করা হলে তা রাজশাহী ও রংপুর—উভয় বিভাগের মাঝামাঝি একটি আদর্শ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। এতে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও বা রংপুরের মতো দূরবর্তী জেলার মানুষকে দাপ্তরিক কাজের জন্য অতিরিক্ত পথ অতিক্রম করতে হবে না। অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রীর এই পদক্ষেপের বিপরীতে অত্যন্ত কঠোর ও আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখান রাজশাহীর জ্যেষ্ঠ নেতা ও ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু। রাজশাহীতে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে মিনু সাফ জানিয়ে দেন যে, নেসকো কেবল নয়, রাজশাহীতে প্রতিষ্ঠিত কোনো সরকারি দপ্তরের ইটও অন্য জেলায় সরাতে দেওয়া হবে না। তিনি স্থানীয় মর্যাদা ও জন্মভূমির আবেগকে প্রাধান্য দিয়ে ঘোষণা করেন যে, পদের চেয়ে তাঁর কাছে রাজশাহীর স্বার্থই প্রথম ও প্রধান।
দুই প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানটির স্থান নির্ধারণের মতো নিছক প্রশাসনিক প্রক্রিয়াটি একটি জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতির প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজশাহীতে যেখানে ব্যবসায়ী, সুশীল সমাজ ও নাগরিক সংগঠনগুলো রাজশাহীর প্রশাসনিক গুরুত্ব কমানোর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলছে, সেখানে বগুড়ার সাতমাথায় শাহে আলমের সমর্থকরা উল্টো মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করছেন। এক নেতা রাজশাহীর চিৎকারকে কটাক্ষ করে জোনাল অফিস নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন, তো অন্য নেতা ঠিকাদারদের কথা অগ্রাহ্য করার হুঁশিয়ারি ছুড়ছেন। এমন খোলামেলা ব্যক্তিগত আক্রমণ ও আঞ্চলিকতার চর্চাকে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও অমূলক বলে অভিহিত করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান। তিনি মনে করেন যে, একটি রাষ্ট্রীয় সেবামূলক সংস্থাকে কেন্দ্র করে এমন আবেগপ্রবণ ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অনুচিত, বরং সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত পুরোপুরি অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি, পরিচালন ব্যয় এবং গ্রাহক সেবার মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে।
তবে নেসকোর ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রার শুরুতেই তাদের প্রধান কার্যালয় বগুড়ায় স্থাপনের প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল। যার সুবাদে সেখানে সাড়ে ৫১ একর জমি অধিগ্রহণ করে গ্রিড ও প্রয়োজনীয় অফিস কাঠামো প্রস্তুত রাখা আছে। কেবল সাময়িক সুবিধার জন্য রাজশাহীতে কার্যক্রম চালু করা হলেও পরবর্তীতে সেটি স্থায়ী রূপ নেয়। নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি সম্ভাব্যতা যাচাই কমিটি গঠিত হয় এবং গত এপ্রিলে ওই কমিটি বগুড়ার পুরোনো পাওয়ার ভবনের সংলগ্ন অবকাঠামো সরেজমিনে পরিদর্শন করে স্থানান্তরের পক্ষেই মত দেয়। কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বগুড়ায় অফিস স্থানান্তরিত হলে রংপুর থেকে প্রধান কার্যালয়ের দূরত্ব ২১৮ কিলোমিটার থেকে কমে ১০৫ কিলোমিটারে নেমে আসবে, যা প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অভূতপূর্ব গতি প্রদান করবে।
সম্ভাব্যতা যাচাই কমিটির অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে যে, ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে রংপুর অঞ্চলে কার্যকর মনিটরিং করা নেসকের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। ফলে ওই অঞ্চলে সিস্টেম লস এবং বকেয়া বিল আদায়ে স্থবিরতা তৈরি হচ্ছিল। রংপুর থেকে কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক কাজে বারবার রাজশাহী যাতায়াতের ফলে সরকারের বিশাল অংকের ভ্রমণ ভাতা এবং অতিরিক্ত সময় অপচয় হচ্ছিল। বগুড়ায় করপোরেট হেড অফিস হলে ঢাকা ও বিদ্যুৎ বিভাগের সাথেও সরকারি সমন্বয় সহজ হবে, যা পুরো উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুতায়ন ব্যবস্থার ওপর ধনাত্মক প্রভাব ফেলবে।
প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ শীর্ষ কর্মকর্তারাও প্রশাসনিক কাঠামোর আধুনিকায়নে স্থানান্তরের পক্ষে মতামত দিচ্ছেন। নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মশিউর রহমান স্পষ্ট করেছেন যে, পুরানো কাঠামো ভেঙে কেবল ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরসহ করপোরেট ইউনিটটি বগুড়ায় নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ঢাকার সাথে দূরত্ব ৬২ কিলোমিটার কমিয়ে এনে বিশাল অর্থনৈতিক সাশ্রয় আনবে। মূল ডেটা সেন্টার, প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর এবং পরিকল্পনা বিভাগ রাজশাহীতেই অপরিবর্তিত থাকবে। ফলে দুই বিভাগের ব্যালান্স অক্ষুণ্ণ রেখে সিস্টেম লস কমানো এবং রাজস্ব বৃদ্ধি করাই যেখানে মূল লক্ষ্য, সেখানে বিষয়টি রাজনৈতিক আঞ্চলিকতার লড়াইয়ে রূপ নেওয়ায় হতাশ সাধারণ বিদ্যুত গ্রাহকরা।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ