• শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:১১ অপরাহ্ন
Headline
সড়ক দুর্ঘটনার নামে টার্গেট কিলিং জিডিপির ৫ শতাংশ চিকিৎসা খাতে ব্যয় করা হবে: মির্জা ফখরুল সরকারের কাজে গাফিলতি হলে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী: রিজভী সরকার ও জনগণের মধ্যে তথ্যের সেতুবন্ধনে পিআইডি’র ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ : তথ্য প্রতিমন্ত্রী প্রাপ্য মনে করলে সরকার সমিতিকে প্লট দেবে: গণপূর্তমন্ত্রী আলিয়া মাদ্রাসায় ফের সংঘর্ষের শঙ্কা, সতর্ক অবস্থানে পুলিশ সবার আগে বাংলাদেশ বললেও বিএনপি ভারতকে ভয় পাচ্ছে: নাহিদ ইসলাম তরুণদের মাদকে ঠেলে দিয়েছে পতিত সরকার: অর্থ উপদেষ্টা উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে বিশৃঙ্খলা ছড়াবেন না: জামায়াত আমির বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিয়ে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে একটি চক্র: প্রধানমন্ত্রী

রামপালে ২৫শ কোটি টাকার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র: মিলবে ৪৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

Reporter Name / ১ Time View
Update : শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬

প্রাথমিক জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা হ্রাস করা এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের সার্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত করতে এক সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। বাগেরহাটের রামপালে দেশের সর্ববৃহৎ ৪৪২ মেগাওয়াট সক্ষমতার গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বিপিডিবির তৈরি করা প্রকল্প প্রস্তাবনা থেকে জানা যায়, উচ্চ ক্ষমতার এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গড়ে তুলতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। যেখানে বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিল থেকে সরবরাহ করা হবে ২ হাজার ১২৭ কোটি টাকা এবং অবশিষ্ট ৩৭৫.৯৪ কোটি টাকা বিপিডিবির নিজস্ব তহবিল থেকে জোগানো হবে। ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে এবং কেন্দ্রটিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রস্তাব করা হয়েছে মাত্র ৬.১৮ টাকা।
ইতোমধ্যে প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) চূড়ান্ত অনুমোদন ও আনুষ্ঠানিক বরাদ্দের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। উক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পটভূমি হিসেবে দেখা যায়, ২০১২ সালে বাগেরহাট জেলার রামপালে বিপিডিবি যৌথ উদ্যোগে বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির উদ্দেশ্যে মোট ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল। সম্পূর্ণ জমিটিকে ‘ব্লক-এ’ এবং ‘ব্লক-বি’ নামে দুইভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ‘ব্লক-এ’ অংশে ইতিপূর্বে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক ‘মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট’ গড়ে তোলা হয়েছে। বাকি ‘ব্লক-বি’ অংশের ৬৮৫ একর জমি বর্তমানে বিপিডিবির প্রত্যক্ষ অধীনে অব্যবহৃত অবস্থায় ছিল, যেখানে মাটি ভরাটসহ আনুষঙ্গিক প্রাথমিক প্রস্তুতিমূলক কাজ আগেই সম্পন্ন করে রাখা হয়েছিল।
শুরুতে রামপালের এই জমিতে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ উদ্যোগে প্রকল্প করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও, বিদ্যুতের বিশেষ বিধান আইন ২০২৪ বাতিলের পর পূর্বের সকল স্থগিত প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের মে মাসে সরকারঘোষিত ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফেসিলিটেশন কোম্পানির (আইআইএফসি) মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়। তাদের সমীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রস্তুতকৃত অব্যবহৃত ‘ব্লক-বি’ জমিতে ৬৮৫ একর জুড়ে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌর প্যানেল ও সমন্বিত গ্রিড স্থাপন করা পুরোপুরি লাভজনক ও বাস্তবসম্মত। যেহেতু এই জমিতে নতুন করে মাটি ভরাটের মতো বড় ধরনের কোনো খরচ প্রয়োজন পড়বে না, সেহেতু অবকাঠামোগত নির্মাণ ব্যয় অনেক কমে আসবে এবং এর ফলশ্রুতিতে উৎপাদিত বিদ্যুতের ট্যারিফ বা প্রতি ইউনিটের মূল্য সাধারণ গ্রাহকদের জন্য বেশ সাশ্রয়ী হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক খোলা দরপত্রের মাধ্যমে কাজ পরিচালনা করা হলে প্রতিযোগিতামূলক দামে কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে অনুমোদিত অন্যান্য সৌর প্রকল্পের তুলনায় রামপাল প্রকল্পের অর্থনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকারিতা বেশ জোরালোভাবে ফুটে উঠেছে। যেমন গত বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ফেনীর সোনাগাজীতে ২২০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছিল, যা ১ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অফ বাংলাদেশ লিমিটেড (ইজিসিবি) বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু দুটি প্রকল্পের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সোনাগাজী প্রকল্পের প্ল্যান্ট ক্যাপাসিটি ইউটিলাইজেশন ফ্যাক্টর বা দক্ষতা ২১ শতাংশ হলেও এর নির্মাণ ব্যয় রামপালের চেয়ে অনেক বেশি। সোনাগাজীতে প্রতি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে অবকাঠামো ও সঞ্চালন লাইন নির্মাণ খরচ পড়েছে ৬.২৭ কোটি টাকা, যেখানে রামপালে প্রতি মেগাওয়াটের খরচ মাত্র ৫.৬৬ কোটি টাকা।
নির্মাণ খরচের এই বিশাল ব্যবধানের সরাসরি প্রভাব পড়েছে উৎপাদিত বিদ্যুতের পাইকারি বিক্রয়মূল্যের ওপর। সোনাগাজী কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে সরকারকে ৮.৮৭ টাকা গুণতে হবে, যেখানে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রস্তাবিত প্রতি ইউনিটের দাম মাত্র ৬.১৮ টাকা। অর্থাৎ সোনাগাজী প্রকল্পের বিদ্যুতের দাম রামপালের চেয়ে প্রায় ৪৩ শতাংশ বেশি। যদিও সোনাগাজী থেকে বার্ষিক ৩৮১.৫৪ কোটি টাকা এবং রামপাল থেকে ৩৫২.৪১ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তবুও দীর্ঘমেয়াদে কম খরচে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিচারে রামপাল প্রকল্প অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও কৌশলগতভাবে এগিয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশে শিল্পায়ন, ডিজিটালাইজেশন, বাণিজ্যিক প্রসার এবং জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির দরুন বিদ্যুতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রতিনিয়ত রেকর্ড গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমন্বিত শক্তি ও বিদ্যুৎ মাস্টারপ্ল্যান ২০২৩ অনুযায়ী, ২০৩০ সালে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা দাঁড়াবে ২৯ হাজার ২৫৭ মেগাওয়াটে, যা ২০৪১ সালে ৫৮ হাজার ৫৯৭ মেগাওয়াট এবং ২০৫০ সালে ৯৬ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট স্পর্শ করবে। অথচ ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই দেশে সর্বকালের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড ছিল মাত্র ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ শতভাগ মানুষের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেলেও চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা ও জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখা একটি বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সংকট কাটাতে এবং আন্তর্জাতিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তির প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব শক্তির প্রসার ঘটানো হচ্ছে। সরকার প্রণীত ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫’ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ সবুজ উৎস থেকে উৎপাদনের বাধ্যতামূলক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার চাহিদার তুলনায় খুবই নগণ্য। এই পরিস্থিতিতে রামপালের ৪৪২ মেগাওয়াটের বিশাল সৌর প্রকল্প জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য শক্তির হার দ্রুত বৃদ্ধি করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব নূর আহমেদ জানিয়েছেন যে, রামপাল এলাকায় প্রস্তাবিত ৪৪২ মেগাওয়াটের এই বিশাল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প দেশের জ্বালানি খাতের রূপান্তরে একটি মাইলফলক উদ্যোগ। ফেনীর ২২০ মেগাওয়াটের প্রকল্পের চেয়ে দ্বিগুণ বড় এই কেন্দ্রটি কম উৎপাদন খরচের কারণে অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত টেকসই। ডিপিপি অনুমোদনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে দ্রুত বাস্তবায়নে গেলে এটি জাতীয় গ্রিডের ওপর আমদানিকৃত জ্বালানির চাপ অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category