বিগত দেড় দশক ধরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটি ছিল হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিপরীতে ধর্মনিরপেক্ষতা ও মধ্যপন্থার এক অনন্য দুর্গ। প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ জনসংখ্যার এই রাজ্যে ২৫ শতাংশের বেশি মুসলিম ধর্মাবলম্বী হওয়ায়, ভোটাররা বারবার মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি আস্থা রেখেছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ভারতের এই অন্যতম প্রধান সীমান্তবর্তী রাজ্যের সমীকরণ পুরোপুরি উল্টে দিয়েছে। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় ২০৭টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করেছে বিজেপি। আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন কট্টরপন্থী নেতা শুভেন্দু অধিকারী। শুভেন্দু অধিকারীর এই উত্থান এবং তাঁর অতীত ও বর্তমানের বাংলাদেশবিরোধী অনমনীয় অবস্থান Dalmatian বা স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে—নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য পশ্চিমবঙ্গ আর কতটা নিরাপদ?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে সংঘটিত ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই শুভেন্দু অধিকারী বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান আরও তীব্র ও আক্রমণাত্মক করতে শুরু করেন। বিশেষ করে বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর কথিত নির্যাতন এবং চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তির দাবিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি একের পর এক বিতর্কিত মন্তব্য ও পদক্ষেপের ঘোষণা দেন।
২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর পেট্রাপোল সীমান্তে এক বিশাল সমাবেশে শুভেন্দু প্রথম বড় আকারের কড়া বার্তা দেন। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ভারতের সীমান্ত বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন আলু ও পেঁয়াজ রপ্তানি পুরোপুরি আটকে দেওয়া হবে। এর কিছুদিন পর, ৮ ডিসেম্বর এক জনসভায় বাংলাদেশ থেকে কলকাতা দখলের কথিত কিছু উসকানিমূলক বক্তব্যের সূত্র ধরে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতাকে তীব্রভাবে কটাক্ষ করেন তিনি। ভারতের রাফাল যুদ্ধবিমান এবং সামগ্রিক সামরিক শক্তির দোহাই দিয়ে তিনি দাবি করেন, সামরিক দিক থেকে বাংলাদেশ ভারতের সমকক্ষ নয়।
২০২৫ সালের শুরু থেকে শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক ভাষা আরও বেশি আক্রমণাত্মক ও যুদ্ধংদেহী হয়ে ওঠে। ১২ জানুয়ারি তিনি প্রকাশ্য সমাবেশে দাবি করেন, ভারত চাইলে আধুনিক ড্রোন技术的 সাহায্যেই বাংলাদেশকে দ্রুত মোকাবিলা করতে সক্ষম। এর ঠিক এক সপ্তাহ পর, ১৯ জানুয়ারি বারাসতের এক অনুষ্ঠানে তিনি মন্তব্য করেন, বাংলাদেশ-ভারত সংঘাত হলে ভারতের জন্য সেটি দীর্ঘমেয়াদি কোনো যুদ্ধ নয়, বরং ‘কয়েক মিনিটেই’ তার সমাধান সম্ভব।
বছরের শেষভাগে এসে ২২ ডিসেম্বর তিনি ১০ হাজার কর্মী নিয়ে কলকাতার বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশন ঘেরাওয়ের ডাক দেন এবং তার মাত্র পাঁচ দিন পর, ২৭ ডিসেম্বর এক বিবৃতিতে ইসরায়েল যেভাবে গাজায় সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, ঠিক সেভাবে বাংলাদেশকে ‘শিক্ষা’ দেওয়ার বিতর্কিত ও উগ্র মন্তব্য করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন শীর্ষ নেতার মুখ থেকে আসা এসব লাগাতার হুমকি পশ্চিমবঙ্গে আসা সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিকদের মনে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা ও মনস্তাত্ত্বিক ভীতি তৈরি করেছে।
শুভেন্দু অধিকারীর এই লাগাতার প্রচারণার ফল শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, بلکه তা সাধারণ সামাজিক স্তরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের পর থেকে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, কলকাতার অনেক নামী-দামী হোটেল ও মোটেল যৌথ সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশি পর্যটকদের রুম দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু নামকরা বেসরকারি হাসপাতাল বাংলাদেশ থেকে যাওয়া রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে, যা চিকিৎসার জন্য যাওয়া হাজার হাজার মুমূর্ষু বাংলাদেশিকে চরম বিপাকে ফেলে। সীমান্ত জেলা মালদা ও মুর্শিদাবাদে ‘হিন্দু বাঁচাও’ র্যালির মাধ্যমে যে তীব্র মেরুকরণ তৈরি করা হয়েছে, তার পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে ভ্রমণকারীদের ওপর।
বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় ভীতিটি তৈরি হয়েছে ভারতের অন্যান্য রাজ্যে ঘটে যাওয়া কিছু লোমহর্ষক গণপিটুনির ঘটনার কারণে। বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে আগে যেখানে কেবল গো-মাংস খাওয়া বা ধর্মীয় কারণে হিংসা ছড়াত, সেখানে সাম্প্রতিক সময়ে ‘বাংলাদেশি সন্দেহে’ পিটিয়ে মারার এক নতুন প্রবণতা দেখা গেছে। যেমন অন্ধ্র প্রদেশের প্রকাশম জেলার কোমারোলু এলাকায় পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসিন্দা এবং পেশায় জরি কারিগর মঞ্জুর আলম লস্করকে ‘বাংলাদেশি চোর’ আখ্যা দিয়ে উগ্রবাদীরা পিটিয়ে হত্যা করে।
একইভাবে উড়িষ্যার সম্বলপুরে মুর্শিদাবাদ থেকে কাজ করতে যাওয়া জুয়েল রানা নামের এক নির্মাণ শ্রমিককে এবং কেরালার পালাক্কাড় জেলায় ছত্তিশগড়ের এক আদিবাসী হিন্দু পরিবারের সন্তান রামনারায়ণ বাঘেলকে স্রেফ বাংলাদেশি অবয়ব ও ভাষা সন্দেহে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে এখন খোদ শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ায়, ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতো এখানেও বাংলাদেশি সন্দেহে বা স্রেফ জাতীয়তার কারণে সাধারণ পর্যটকরা কোনো উগ্র মবের হিংসার শিকার হবেন কি না, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নিরাপত্তার এই চরম উদ্বেগ এবং ভারত সরকারের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশটির পর্যটন অর্থনীতিতে। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশি পর্যটক ছাড়া ভারতের বিদেশি পর্যটন খাত কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভারতে আসা মোট বিদেশি পর্যটকের প্রায় ২০ থেকে ২৩ শতাংশই ছিলেন বাংলাদেশি। অর্থাৎ প্রতি চার থেকে পাঁচজন বিদেশি পর্যটকের একজনই ছিলেন বাংলাদেশ থেকে। ২০১৭ সালের পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ২০ লাখের বেশি বাংলাদেশি ভারতে গেছেন এবং ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ ৮০ হাজার বাংলাদেশি ভারত ভ্রমণ করেন। এমনকি ২০২২ ও ২০২৩ সালেও এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১২ লাখ ৮০ হাজার ও ২১ লাখ ২০ হাজার।
তবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর এই সংখ্যা কমে ১৭ লাখ ৫০ হাজারে নামে এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে এসে তা এক অবিশ্বাস্য ধসের মুখোমুখি হয়। ২০২৫ সালে ভারত সফর করেছেন মাত্র ৪ লাখ ৭০ হাজার বাংলাদেশি পর্যটক, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭৩ শতাংশ কম। বাংলাদেশি পর্যটকদের এই অনুপস্থিতির কারণে ২০২৫ সালে ভারতে মোট বিদেশি পর্যটক আগমন ছিল ৯০ লাখ ১৬ হাজার, যা গত তিন বছরের মধ্যে দেশটির সর্বনিম্ন রেকর্ড।
নির্বাচনের আগে বা প্রচারণার স্বার্থে শুভেন্দু অধিকারী যেসব চরমপন্থী মন্তব্য করেছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটার লক্ষণ স্পষ্ট হচ্ছে। মোদীর গুজরাট বা যোগী আদিত্যনাথের উত্তর প্রদেশের মতো এখন পশ্চিমবঙ্গও যদি উগ্র হিন্দুত্ববাদী এবং কট্টর অভিবাসন-বিরোধী নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে শুরু করে, তবে এই রাজ্যটি বাংলাদেশিদের জন্য তার ঐতিহ্যগত স্বস্তি ও গ্রহণযোগ্যতা পুরোপুরি হারাবে। ಐনি কড়াকড়ি, প্রতিনিয়ত বাংলাদেশি হিসেবে সন্দেহভাজন হওয়ার মানসিক চাপ এবং উগ্র সামাজিক মনোভাবের কারণে পশ্চিমবঙ্গ আর আগের মতো নিরাপদ নেই—ভ্রমণকারীদের এই আশঙ্কাই এখন পরিসংখ্যানের মাধ্যমে প্রমাণিত। বর্তমান পরিস্থিতিতে খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সাধারণ পর্যটকদের জন্য পশ্চিমবঙ্গ বা ভারত ভ্রমণ এক বড় ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে।
তথ্যসূত্র: জাগোনিউজ