• শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৭ অপরাহ্ন

যুক্তরাজ্যে বিশ্বের প্রথম মন্ত্রিসভা পর্যায়ের এআই মন্ত্রী

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

একসময়ে যেকোনো দেশের রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে অর্থ, প্রতিরক্ষা বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হতো। তবে প্রযুক্তির দ্রুত বিবর্তনের কারণে একুশ শতকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে গেছে। আজকের আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি চলে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মতো যুগান্তকারী প্রযুক্তির হাতে, যা কয়েক বছরের ব্যবধানে মানুষের কর্মসংস্থান, বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং এমনকি আধুনিক যুদ্ধবিদ্যার কৌশলকেও সম্পূর্ণ বদলে দিতে শুরু করেছে। এই বৈশ্বিক প্রযুক্তি বিপ্লবের সাথে তাল মেলাতে এবং প্রযুক্তি দৌড়ে নিজেদের শীর্ষ অবস্থান নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্য সরকার এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বিশ্ব রাজনীতিতে প্রথমবারের মতো সরাসরি মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে একজন পূর্ণাঙ্গ ‘এআই মন্ত্রী’ নিয়োগ দিয়েছে দেশটি। যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটি কেবল একটি নতুন মন্ত্রণালয় সৃষ্টির গল্প নয়, বরং এটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় ব্রিটেনের শক্তিশালী অবস্থানের এক স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা।

যুক্তরাজ্যের প্রথম এআই এবং অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে গুরুদায়িত্ব পেয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত তরুণ রাজনীতিক কনিষ্ক নারায়ণ। ভারতের বিহারে জন্ম নেওয়া কনিষ্ক নারায়ণ শৈশবে পরিবারের সাথে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান এবং পরবর্তীতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন। মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশের পূর্বে তিনি সরকারি নীতি নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং প্রযুক্তি খাতের নীতি বিশেষজ্ঞ হিসেবে দীর্ঘদিন সফলতার সাথে কাজ করেছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টির টিকিটে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রযুক্তি নীতিতে তার অসামান্য দক্ষতার ভিত্তিতে তাকে সরাসরি মন্ত্রিসভার টেবিলে নিয়ে আসা হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই নতুন পদক্ষেপের পর থেকে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভায় এআই কেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছেছে।

একজন এআই মন্ত্রীর কাজের পরিধি কেবল প্রযুক্তি খাতের নজরদারির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সরকারি সেবা গতিশীল করা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের তথ্য গোপনীয়তা নিশ্চিত করা পর্যন্ত বিস্তৃত। নতুন এই মন্ত্রীর প্রাথমিক দায়িত্ব হলো কীভাবে জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্পকারখানা এবং সার্বিক সরকারি প্রশাসনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপদ ও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। পাশাপাশি দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে প্রবৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে এআই প্রযুক্তির উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং একই সাথে প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা তার প্রধান চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তি বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে এআই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কব্জায় নিতে মরিয়া, তখন বিশ্বখ্যাত ডিপমাইন্ডের জন্মদাতা যুক্তরাজ্য নিজেদেরকে এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে রাখতে চায় না। ব্রিটিশ সরকারের বিশ্বাস, সময়োপযোগী ও আধুনিক নীতি প্রণয়ন করতে পারলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দেশে লক্ষাধিক নতুন কর্মসংস্থান এবং অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধির দুয়ার খুলে দেবে।

তবে নতুন এই পদ সৃষ্টি ও এআই সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া পুনর্গঠন নিয়ে দেশটির বিশেষজ্ঞ মহলে তীব্র তর্ক-বিতর্ক ও সংশয় দেখা দিয়েছে। সরকার একই সাথে বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি বিভাগকে (ডিএসআইটি) পুনর্গঠন করে এআই সংক্রান্ত দায়িত্ব বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ায় সমন্বয়হীনতার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রযুক্তিবিদরা। তাদের মতে, সুনির্দিষ্ট ও একক কোনো কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাঠামো ছাড়া কেবল একজন মন্ত্রী নিয়োগ দিলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সিদ্ধান্তের গতি শ্লথ হয়ে যেতে পারে। এর পাশাপাশি কনিষ্ক নারায়ণের সামনে সবচেয়ে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে মানুষের অটোমেশন ও চাকরি হারানোর ভয়। কাস্টমার সার্ভিস, অ্যাকাউন্টিং, কনটেন্ট তৈরি এবং কোডিংয়ের মতো পেশায় এআই মানুষের স্থলাভিষিক্ত হওয়ায় সাধারণ নাগরিকদের মনে জীবিকা নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম উৎকণ্ঠা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এআই বিপ্লবের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুত না পৌঁছালে এবং কর্মসংস্থান সংকটের সমাধান না হলে দেশে তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।

চাকরির উদ্বেগের পাশাপাশি নতুন এআই মন্ত্রীর জন্য দ্বিতীয় বড় পরীক্ষা হলো আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক নজরদারি ও তথ্যের অপব্যবহার রোধ করা। ফেসিয়াল রিকগনেশন, ডিপফেক ভিডিও এবং ভুয়া খবরের সয়লাব রোধে কঠোর আইনি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি, যা আবার যেন নতুন উদ্ভাবনের গতিকে থামিয়ে না দেয়। তৃতীয়ত, বিশাল আকারের এআই মডেল পরিচালনা করতে যে বিশাল ডেটা সেন্টার ও বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানির প্রয়োজন হয়, তা যুক্তরাজ্যের বিদ্যমান অবকাঠামোর জন্য এক বিশাল চাপ। অতি সম্প্রতি ওপেনএআই-এর একটি বড় প্রকল্প অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচের অজুহাতে পিছিয়ে যাওয়ায় ব্রিটেনের জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বিশাল অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিক সামর্থ্যের সাথে টেক্কা দিতে হলে ছোট অর্থনীতির যুক্তরাজ্যকে দ্রুত নীতি নির্ধারণ, দক্ষ জনবল সৃষ্টি এবং সুরক্ষার মানদণ্ডে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে। যুক্তরাজ্যের এই ঐতিহাসিক এআই নীতি সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে উদ্ভাবন, বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি এবং জনআস্থার সুষ্ঠু ভারসাম্যের ওপর, যা আগামী দিনে বিশ্বপ্রযুক্তির মানচিত্রে দেশটির ভাগ্য নির্ধারণ করবে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category