• শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৬ অপরাহ্ন
Headline
‘বাংলার জয়যাত্রা’ ছাড়িয়ে নিতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান রাখাইনেই : পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ ও ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর ঘোষণা: উপজেলা চিকিৎসকদের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের ২ মাসেই সরকারের ৬০টি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ বাস্তবায়ন: মাহদী আমিন ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে ৫ কৃষকের মর্মান্তিক মৃত্যু রাজনীতির ‘বসন্তের কোকিল’ বনাম তৃণমূলের দীর্ঘশ্বাস: টিকে থাকবে কে? তেলতেলে বিশ্বনীতি: আবারও কি বিদ্যুৎ যন্ত্রণায় বাংলাদেশ! এনসিপিতে যোগ দেওয়ার গুঞ্জন স্রেফ গুজব, আদর্শ বিকিয়ে জোটে যাব না: রুমিন ফারহানা কোচিং বাণিজ্য রোধ ও স্কুল সংস্কারে বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার: ববি হাজ্জাজ ৪১৯ জন হজযাত্রী নিয়ে জেদ্দায় পৌঁছাল প্রথম হজ ফ্লাইট

রাজনীতির ‘বসন্তের কোকিল’ বনাম তৃণমূলের দীর্ঘশ্বাস: টিকে থাকবে কে?

Reporter Name / ২ Time View
Update : শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬

রাজনীতি বড় বিচিত্র এক খেলা। এখানে যেমন আছে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও তীব্র ঘৃণা, তেমনি আছে এক বিশেষ প্রজাতির রাজনৈতিক পাখির বিচরণ—যাদের আমরা আদর করে বলি ‘সুদিনের কোকিল’। প্রকৃতির কোকিল যেমন কেবল বসন্তের হাওয়ায় গান গায় আর শীতের রুক্ষতায় উধাও হয়ে যায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতেও এই প্রজাতির সংখ্যা দিন দিন কেবল বেড়েই চলেছে। রাজনীতিতে একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘এখানে কেউ চিরস্থায়ী বন্ধু বা চিরস্থায়ী শত্রু নয়’। কিন্তু একটি বিষয় সব সময়ই চিরস্থায়ী, আর তা হলো—‘সুযোগ’। এই সুযোগকে কেন্দ্র করেই রাজনীতিতে জন্ম নেয় অসংখ্য সুবিধাবাদী মুখ।

ঝড়ের দিনে কোকিলেরা কোথায় থাকে?

শীতের তীব্রতায় যেমন কোকিল দেখা যায় না, তেমনি দলের দুঃসময়ে, অর্থাৎ যখন দলের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যায়, তখন এই সুদিনের কোকিলদের টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যায় না। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, দলের চরম ক্রান্তিলগ্নে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকে কেবল সেই সাধারণ মানুষগুলো, যারা বছরের পর বছর হামলা-মামলা খেয়ে পালিয়েছে, আবার ফিরে এসেছে, আবার কারাবরণ করেছে। তবুও তারা কখনো দল ছাড়েনি, আদর্শ বিকোয়নি।

নিষিদ্ধ দলের তৃণমূলের বর্তমান চিত্র

বাংলাদেশের রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট অত্যন্ত নাটকীয়। একটি নির্দিষ্ট দল, যার ইতিহাস একসময় দেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল, আজ সেই দলটির রাজনীতি নিষিদ্ধ। নামটাও হয়তো মুখে নেওয়ার উপায় নেই, তবে সবাই বোঝে কার কথা বলা হচ্ছে। এই দলটির শীর্ষ নেতাদের অনেকেই আজ দেশছাড়া, কেউ নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছেন, আবার কেউ আছেন অন্তহীন অপেক্ষার প্রহরে।

সবচেয়ে চরম ও কঠিন সময় পার করছেন এই দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। একজন তৃণমূল কর্মীর জীবন এখন অনেকটা সেই হতভাগা পরীক্ষার্থীর মতো, যে পরীক্ষার হলে ঢুকেছে ঠিকই, কিন্তু হাতে কোনো প্রশ্নপত্র পায়নি। সে কেবল বসে আছে আর চারদিকে তাকাচ্ছে। কারণ, তার রাজনীতি করার কোনো সুযোগ নেই, প্রকাশ্যে দাঁড়ানোর অধিকার নেই এবং সবচেয়ে বড় কথা—ভবিষ্যৎ নিয়ে তার সামনে কোনো নিশ্চয়তাই নেই।

আশার গুড়ে বালি ও নাটকের রিহার্সাল

নির্বাচনের আগে এই তৃণমূলের মনে কিছুটা আশা জেগেছিল। শোনা গিয়েছিল, নতুন সরকার গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে এবং কারো রাজনীতি চিরতরে বন্ধ করতে চায় না। এই আশাতেই অনেকে নীরব সমর্থন জুগিয়েছিলেন। কিন্তু রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা হলো, এখানে প্রতিশ্রুতি থাকে, কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে তার মিল থাকে না। সরকার গঠনের পরপরই সেই বাস্তবতা পরিষ্কার হয়ে গেল। নিষেধাজ্ঞা তো উঠলই না, বরং তা আরও কঠিন হলো।

মাঝেমধ্যে কিছু এলাকায় দলীয় কার্যালয় খোলার চেষ্টা যে হয়নি তা নয়। তবে সেগুলোর দৃশ্যপট ছিল অনেকটা নাটকের রিহার্সালের মতো! তালা খোলা হলো, ভেতরে ঢুকে দুটো স্লোগান দেওয়া হলো, আর তারপর তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে আবার তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হলো। এখন সেই কার্যালয়গুলো কেবল ভাঙা দেয়াল আর বন্ধ দরজার স্মৃতি নিয়ে খাঁ খাঁ করছে।

নেতারা কোথায়? তৃণমূলের এক অমোঘ প্রশ্ন

এদিকে তৃণমূলের ভেতরে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো—নেতারা আজ কোথায়? যারা একসময় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন, তারা আজ যোজন যোজন দূরে। কেউ কারাগারে, কেউবা বিদেশে। এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য খুব সহজ নয়। কারণ, দুঃসময়ে সামনে আসা মানে কেবল নেতৃত্ব দেওয়া নয়, বরং বুকের ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি টেনে আনা। আর এই ঝুঁকি নেওয়ার মতো বুকের পাটা সবার থাকে না।

সতেরো বছর পর ফেরা দল ও নব্য কোকিলদের উপদ্রব

এবার মুদ্রার উল্টো পিঠে তাকানো যাক। একটি দল, যারা দীর্ঘ সতেরো বছর ক্ষমতার বাইরে চরম নিষ্পেষিত অবস্থায় ছিল, আজ তারা মূলধারায়। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এখন অসংখ্য নতুন মুখ এসে ভিড় জমাচ্ছে আর বলছে, “আমরাও দলের সঙ্গে আছি!” রাজনীতিতে এই “আমরাও আছি” শব্দবন্ধটি অত্যন্ত ভয়ংকর। কারণ, যারা সত্যি সত্যি দুঃসময়ে দলের সঙ্গে ছিল, তাদের কখনো বলতে হয় না যে তারা আছে। তাদের উপস্থিতি এমনিতেই টের পাওয়া যায়।

কনক চাঁপার মনোনয়ন ও তৃণমূলের ক্ষোভ

ঠিক এখানেই প্রাসঙ্গিকভাবে চলে আসে বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী কনক চাঁপার প্রসঙ্গ। তিনি দেশের একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রিয় শিল্পী। তাঁর গানে মানুষ ভালোবাসা খুঁজে পায়, তাঁর কণ্ঠে সুর ও আবেগ দুটোই আছে। কিন্তু রাজনীতি আর গান কি একই জিনিস? তিনি যখন সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নের জন্য আবেদন করলেন, তখন দলের ভেতর থেকে যে তীব্র প্রতিবাদ উঠল, তার মূল কারণ কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ ছিল না। তৃণমূলের প্রশ্ন একটাই—দুঃসময়ে আপনি কোথায় ছিলেন? আর এখন সুসময় দেখেই কেন এই দাবি?

রাজনীতি কেবল জনপ্রিয়তার খেলা নয়; এটি ত্যাগ, সময় এবং দীর্ঘ সংগ্রামের এক জটিল হিসাব। কেবল জনপ্রিয়তাই যদি শেষ কথা হতো, তবে দেশের সবচেয়ে বড় অভিনেতা-গায়করাই হতেন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক নেতা। হঠাৎ উড়ে এসে কেউ যখন একটি আসনের দাবি করেন, তখন সেই দলের আসল প্রাণ বা তৃণমূলের মানুষগুলোর কষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ তারা জানে, একটি আসনের পেছনে কত নির্ঘুম রাত, কত হামলা-মামলা এবং কতগুলো ভেঙে যাওয়া পরিবারের দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে আছে।

শেষ কথা: ইতিহাস কাকে মনে রাখবে?

একদিকে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ দলের তৃণমূল কর্মীরা আজ দিশেহারা, অন্যদিকে ক্ষমতায় ফেরা দলের অন্দরে উড়ে এসে জুড়ে বসছে নতুন নতুন কোকিল। উভয় ক্ষেত্রেই গল্পটি আসলে একই। তৃণমূল চিরকালই অবহেলিত, শীর্ষ নেতৃত্ব ধরাছোঁয়ার বাইরে, আর মাঝখানে সুযোগের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে সুবিধাবাদীরা।

শেষ পর্যন্ত কে টিকে থাকবে? সেই বসন্তের কোকিল, নাকি ঝড়ের মধ্যে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকা কর্মীটি? ইতিহাস খুব নির্মম বিচারক। সে কোনো তারকাদ্যুতি মনে রাখে না, সে কেবল মনে রাখে কঠিন সময়ে কে পাশে ছিল।

যেদিন এই প্রশ্নের উত্তর সবাই বুঝতে পারবে, সেদিন রাজনীতি থেকে ‘সুদিনের কোকিল’ নামের প্রজাতিটি হয়তো চিরতরে বিলুপ্ত হবে। রাজনীতি হবে সাধারণ মানুষের। আর যতদিন তা না হচ্ছে, কোকিলেরা এভাবেই ডাকতে থাকবে, আর তৃণমূলের কর্মীরা কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলে যাবে। তবে একটি কথা নিশ্চিত—যে মাটি যত বেশি দগ্ধ হয়, সেই মাটিতেই সবচেয়ে শক্ত গাছের জন্ম হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category