দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে ঢাকাকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে এনে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে শহর ও গ্রামের স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য দূর করে একটি জবাবদিহিমূলক, টেকসই এবং জনগণকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সম্মেলন-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধে জোর
বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যনীতির মূলভিত্তি ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ (Prevention is better than cure) উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “রোগের শুরুতেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে পারলে বিস্তার ঠেকানো সম্ভব। বর্তমানে দেশের মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশই হচ্ছে অসংক্রামক রোগের কারণে। তাই উপজেলা পর্যায়েই ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগের নিয়মিত স্ক্রিনিং ও জীবনযাপনের ধরন পরিবর্তনে সচেতনতা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।”
যুক্তরাজ্যের আদলে স্বাস্থ্যসেবা ও ১ লাখ হেলথ কেয়ারার নিয়োগ
দেশের স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান সরকার ক্রমান্বয়ে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS)-এর জেনারেল প্র্যাকটিশনার (GP) আদলে প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়নে একটি করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করা হবে। এসব ইউনিটের জন্য দেশজুড়ে ১ লাখ ‘হেলথ কেয়ারার’ নিয়োগ দেওয়া হবে, যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী। তারা সরাসরি মানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন।”
ই-হেলথ কার্ড ও জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা
দেশের প্রতিটি নাগরিকের চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করতে শিগগিরই সমন্বিত ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালু করা হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এর মাধ্যমে নাগরিকের স্বাস্থ্যতথ্য ডিজিটালি সংরক্ষিত থাকবে। পাশাপাশি, চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে কোনো নাগরিক যেন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে জন্য ধাপে ধাপে ‘জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
হামের টিকা নিয়ে বিগত সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা
সারা দেশে শিশুদের হামের টিকা না দেওয়ার ফলে বিগত দুই সরকারের ‘জীবনবিনাশী ব্যর্থতা’কে ক্ষমাহীন অপরাধ বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, “বর্তমান সরকার জরুরি ভিত্তিতে হামের টিকা দিয়ে পরিস্থিতির অবনতি রোধ করেছে। যারা এ কারণে প্রিয় সন্তান হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমি ব্যক্তিগতভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।”
চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান ও সম্মাননা প্রদান
সম্মেলনে উপস্থিত চিকিৎসকদের ‘রোগে-শোকে কাতর মানুষের পরম বন্ধু’ আখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “একজন চিকিৎসকের উপদেশ ও আন্তরিক ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের চেয়েও বেশি কাজ করে। তাই পেশাগত উৎকর্ষের পাশাপাশি মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা আপনাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।” তিনি প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে নিজ নিজ কর্মস্থলকে একটি ‘মডেল স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশ দেন।
সম্মেলনে কর্মদক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ উপজেলা পর্যায়ের ৬ জন চিকিৎসক—ডা. শোভন কুমার বসাক, ডা. মনজুর আল মোর্শেদ চৌধুরী, ডা. মজিবুর রহমান, ডা. সাজিদ হাসান সিদ্দিকী, ডা. সুমন কান্তি সাহা এবং ডা. তাসনিম জুবায়েরকে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে বিশেষ ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস প্রমুখ।