• শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ০২:৪৩ পূর্বাহ্ন
Headline
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চাইলে সংবিধানে সুযোগ আছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী মেডিকেল শিক্ষার্থীদের দেশসেবায় আত্মনিয়োগের আহ্বান ডা. জুবাইদা রহমানের সাংবাদিকতা পেশা নির্ধারণে যথাযথ কর্তৃপক্ষ থাকা জরুরি : তথ্যমন্ত্রী সোনার খাঁচার দিনগুলো বন্দি করার উপায় এবং একটি ঝাপসা ছবির গল্প ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি জনভোগান্তির মূল কারণ: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না জুলাইয়ের বিচার : হামিদুর রহমান আযাদ আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে যা বললেন সালমান খান দিল্লি পুলিশকে ‘গুন্ডা’ বললেন নাসিরুদ্দিন শাহ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে অংশ নিয়ে আটক অভিনেত্রী আয়েশা খান

রোহিঙ্গাদের আবাসন সম্প্রসারণের দাবিতে অনড় জাতিসংঘ তবে সিদ্ধান্তহীনতায় ঢাকা

Reporter Name / ৪২ Time View
Update : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতা ও জাতিগত নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে নতুন করে অনুপ্রবেশ করা প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গার আবাসনের জন্য অতিরিক্ত ভূমি বরাদ্দের অনুরোধ জানিয়েছে জাতিসংঘ। তবে বিশ্ব সংস্থার এই নতুন ও ধারাবাহিক দাবির মুখে ঢাকা এখনও চূড়ান্ত কোনো ইতিবাচক বা নেতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) পক্ষ থেকে বারবার এই বিষয়ে চাপ দেওয়া হলেও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিষয়টিকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মূল্যায়ন করছে। দেশের অভ্যন্তরে এমনিতেই বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতির কারণে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সংকট তৈরি হয়েছে, যার ফলে নতুন করে আর কোনো ফসলি জমি বা বনাঞ্চল রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য ছেড়ে দিতে রাজি নয় স্থানীয় প্রশাসন।

কক্সবাজারে অবস্থিত সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের প্রধান মিজানুর রহমান গতকাল শনিবার গণমাধ্যমকে জানান, বাংলাদেশে নতুন করে আশ্রয় নেওয়া বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার জন্য নতুন করে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র বা ক্যাম্প তৈরি করতে আরও জমি বরাদ্দের দাবিটি ইউএনএইচসিআর আবারও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের সামনে উত্থাপন করেছে। তবে বাংলাদেশ এই স্পর্শকাতর প্রস্তাবটি পুরোপুরি গ্রহণও করেনি, আবার সরাসরি প্রত্যাখ্যানও করেনি। মিজানুর রহমান আরও উল্লেখ করেন যে, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গত দেড় বছরেরও বেশি সময়ের কার্যকালে এই নতুন দেড় লাখ রোহিঙ্গার নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হয়েছিল। তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতা ও দেশটির জান্তা সরকারের সদিচ্ছার অভাবে সেই মহতী উদ্যোগটি এখনও আলোর মুখ দেখতে পারেনি বা সফল হয়নি।

তিন বছরে নতুন অনুপ্রবেশ ও আন্তর্জাতিক চাপ

প্রাপ্ত নথিপত্র এবং আরআরআরসি কার্যালয়ে পাঠানো বিভিন্ন চিঠি পর্যালোচনা করে জানা গেছে, গত ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ইউএনএইচসিআরের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়েছিল। সেই চিঠিতে মূলত ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত দেড় বছরেরও বেশি সময়ে নতুন করে সীমান্ত গলে বাংলাদেশে প্রবেশ করা ১ লাখ ১৩ হাজার অতিরিক্ত রোহিঙ্গার জরুরি আবাসন নিশ্চিত করার জন্য জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে প্রায় দেড় লাখে এসে ঠেকেছে। নতুন করে আসা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কারণে কক্সবাজারের বিদ্যমান ক্যাম্পগুলোর ওপর মানুষের ঘনত্ব এবং মানবিক সেবার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

এই বিষয়ে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক মো. তৌফিক-উর-রহমান গণমাধ্যমকে জানান, উখিয়া ও টেকনাফের বিদ্যমান শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত মানুষের যে উপচে পড়া ভিড় এবং ঘিঞ্জি পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দাতা সংস্থাগুলো মনে করছে, ক্যাম্পের এই অতিরিক্ত ঘনত্বের কারণে সেখানে স্বাস্থ্যঝুঁকি, স্যানিটেশন সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। আর এই কারণেই তারা নতুন করে ক্যাম্পের পরিধি বাড়ানোর জন্য জমি বরাদ্দের বিষয়ে বাংলাদেশকে এক ধরনের পরোক্ষ চাপে রাখছে। তবে বাংলাদেশ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সংকটের মূল সমাধান ভূমি সম্প্রসারণে নয়, বরং দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর মধ্যে নিহিত।

প্রত্যাবাসন ব্যর্থতার দায় ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা

২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সামরিক বাহিনীর নির্মম ও বর্বর ক্র্যাকডাউন এবং জাতিগত নিধনের মুখে বাংলাদেশে ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী ঢল শুরু হয়েছিল। দীর্ঘ ৯ বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের অনমনীয় মনোভাব এবং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপের অভাবের কারণেই মূলত আজ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও তাদের নিজ জন্মভূমিতে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। আর এই ব্যর্থতার দায় সরাসরি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের ওপরই বর্তায় বলে মনে করেন বাংলাদেশের নীতি-নির্ধারকেরা।

বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মোট নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা এক লাফে বেড়ে প্রায় ১৩ লাখে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশের ভূখণ্ডের জন্য এই সংখ্যা অত্যন্ত বড় একটি বোঝা। এর ওপর আরও বড় উদ্বেগের কারণ হলো, ক্যাম্পগুলোতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০ হাজার নতুন শিশুর জন্ম হচ্ছে। জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাওয়া এই জনসংখ্যা বাংলাদেশের সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ, স্থানীয় অর্থনীতি এবং কক্সবাজার অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্যকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। বর্তমানে এই জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার মোট ৩৩টি অস্থায়ী ক্যাম্পে অত্যন্ত ঘিঞ্জি পরিবেশে রাখা হয়েছে। এছাড়া, মূল ভূখণ্ডের ওপর চাপ কমাতে নোয়াখালীর ভাসানচরে আরও একটি সুপরিকল্পিত আবাসন কেন্দ্র বা ক্যাম্প স্থাপন করে সেখানেও হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে স্থানান্তর করা হয়েছে।

বিশ্ব শরণার্থী দিবস ও বৈশ্বিক সংকট

গতকাল শনিবার বিশ্বজুড়ে পালিত ‘বিশ্ব শরণার্থী দিবস’ উপলক্ষে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি এক বিশেষ ও জরুরি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সারা বিশ্বে যুদ্ধ, সহিংসতা, গৃহযুদ্ধ কিংবা রাজনৈতিক নিপীড়নের কারণে নিজ দেশ থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়া প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষায় সমস্ত উন্নত দেশগুলোকে আরও বেশি অর্থায়ন ও সমর্থন বাড়ানোর অনুরোধ জানান। এর আগে গত ১১ জুন, ইউএনএইচসিআর তাদের বার্ষিক ফ্ল্যাগশিপ প্রতিবেদন ‘গ্লোবাল ট্রেন্ডস রিপোর্ট’ প্রকাশ করে। সেই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক অত্যন্ত ভয়াবহ তথ্য। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রতি ১০ জন শরণার্থীর মধ্যে ৭ জনই দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ী বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়ে বছরের পর বছর ধরে অন্য দেশে মানবেতর জীবনযাপন করছেন, যার অন্যতম বড় উদাহরণ বাংলাদেশের এই রোহিঙ্গা সংকট।

এদিকে, গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আবারও অত্যন্ত জোরালোভাবে রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ স্পষ্ট করে বলেছে যে, বছরের পর বছর ধরে চলা এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ এবং নিরাপত্তার ওপর এক অসহনীয় ও ভারী বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। বাস্তুচ্যুত এই মানুষগুলো নিজেরাও আর ক্যাম্পে বন্দি জীবন না কাটিয়ে দ্রুত স্বদেশে সম্মানের সাথে ফিরে যেতে অত্যন্ত আকুল হয়ে আছেন।

জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী গতকাল মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতের উপস্থিতিতে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের ব্রিফিংয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বিশ্বমঞ্চে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের মূল উৎপত্তি হয়েছিল সম্পূর্ণভাবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে এবং তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও জাতিগত বিদ্বেষের কারণে। সুতরাং, এই সংকটের একটি স্থায়ী, টেকসই এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধানও যেকোনো মূল্যে মিয়ানমারের ভেতরেই খুঁজে বের করতে হবে। বাংলাদেশকে নতুন করে জমি দেওয়ার জন্য চাপ না দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত মিয়ানমারের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা, যাতে তারা তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

তথ্যসূত্র: নিউ এজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category