• বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ১২:১৫ পূর্বাহ্ন
Headline
সিংগাইরে সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ ক্যাম্প পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী সন্তানের বয়স ১৮ থেকে ২৪: বাবা-মায়ের জন্য ১০টি পরামর্শ শিশু ইরা মনি হত্যা মামলার রায় পেছাল সমুদ্রবন্দরে তিন নম্বর সংকেত বহাল সারাদেশে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা অর্থমন্ত্রীর অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন: তথ্য উপদেষ্টা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে কোমে খামেনির জানাজা সম্পন্ন স্পেনের কাছে হারের পর পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজের পদত্যাগ চিকিৎসাকে বিশেষ সুবিধা নয় অধিকার ভাবার আহ্বান জুবাইদা রহমানের

সরকারি বেতন বৃদ্ধির মুখে আরও সংকটে বেসরকারি খাতের কর্মীরা

Reporter Name / ৩ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬

দেশের বাজারে লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের সাথে পাল্লা দিয়ে সাধারণ মানুষের পারিশ্রমিক বা মজুরি না বাড়ায় গত সাড়ে চার বছর ধরে আমজনতার কেনাকাটার ক্ষমতা বা প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া এই নেতিবাচক প্রবণতা টানা ৫৩ মাস ধরে অব্যাহত রয়েছে। যার ফলে সীমিত আয়ের এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর সংসার চালানো এখন ভীষণ কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি মাসে বাজারে মূল্যস্ফীতির পারদ যেভাবে ওপরে উঠছে। শ্রমজীবী মানুষের আয়ের প্রবৃদ্ধি তার চেয়ে সবসময় নিচে থাকছে। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রায় ৮৬ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এই বিশাল শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সরকারি সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী। গত জুন মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার সামান্য কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ হলেও তা এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এর আগের মাস মে-তে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। যা ছিল বিগত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এমন একটি চরম উত্তপ্ত বাজার পরিস্থিতির মধ্যেই চলতি জুলাই মাস থেকে দেশে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর জন্য নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হতে যাচ্ছে। যার ফলে তারা বর্ধিত মূল বেতন পেতে শুরু করবেন। এই বেতন বৃদ্ধির খবর সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা—এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সাধারণ বাজারে। বাজারে নতুন করে অর্থপ্রবাহ বাড়ার কারণে জিনিসপত্রের দাম আরেক দফা বৃদ্ধি পেতে পারে। যা মূলত বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে আরও বেশি উসকে দেবে। এর ফলে বেসরকারি খাতে কর্মরত সীমিত আয়ের মানুষ এবং বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণী চরম বিপাকে পড়বে। কারণ তাদের আয় বৃদ্ধির কোনো নিশ্চয়তা নেই। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে যে। বর্তমান বিশ্ব ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতায় খুব দ্রুত মূল্যস্ফীতি কমার কোনো লক্ষণ নেই। এর ওপর সরকারি বেতন বৃদ্ধির চাপ বাজারে নতুন জটিলতা তৈরি করবে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন দমবন্ধ করা পরিস্থিতি বিরাজ করায় মানুষ এখন তাদের মৌলিক খরচের বাইরে বিনোদন। ভ্রমণ ও পর্যটনের মতো খাতগুলোতে ব্যয় একেবারে কমিয়ে দিয়েছে। যা দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের মন্দা ডেকে আনছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসের পর থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত কোনো একটি মাসেও জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতিকে স্পর্শ করতে পারেনি। অথচ ২০২২ সালের আগে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এমন ছিল না; তখন বেশিরভাগ সময়ই মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার বেশি থাকত। যার ফলে মানুষের সঞ্চয় করার সক্ষমতা ছিল। বিবিএস মূলত দেশের ৬৪টি জেলা থেকে কৃষি। মৎস্য। নির্মাণ। পশুপালন। কলকারখানা ও পরিবহনসহ ৬৩ ধরনের অনানুষ্ঠানিক খাতের মজুরির তথ্য সংগ্রহ করে এই সূচকটি তৈরি করে থাকে। যেহেতু দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতে ৫ কোটিরও বেশি নারী ও পুরুষ কঠোর পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাই মূল্যস্ফীতির তুলনায় তাদের দৈনিক বা মাসিক মজুরি না বাড়লে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা সরাসরি তলানিতে গিয়ে ঠেকে। অর্থনৈতিক ভাষায় মূল্যস্ফীতি হলো এক ধরণের প্রচ্ছন্ন কর। যা মানুষের পকেট থেকে নিঃশব্দে টাকা কেড়ে নেয়। একজন সাধারণ মানুষের আয়ের পুরোটাই যখন চাল-ডাল কিনতে শেষ হয়ে যায়। তখন হঠাৎ জিনিসপত্রের দাম বাড়লে তাকে হয় ধারদেনা করে চলতে হয়। না হয় খাবার ও যাতায়াতের মতো জরুরি খাতের খরচ কাটছাঁট করতে হয়।

বেসরকারি খাতের সাধারণ চাকরিজীবীদের বাস্তব জীবন চিত্রও এখন অত্যন্ত করুণ। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন শহরতলীতে বসবাসকারী বেসরকারি আবাসন খাতের কর্মীরা জানাচ্ছেন। গত কয়েক বছরে তাদের বাড়িভাড়া কয়েক দফায় বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে বেতন বাড়েনি। তিন-চার বছর আগেও যারা প্রতি মাসে চার-পাঁচ হাজার টাকা সঞ্চয় করতে পারতেন। তারা এখন মাসের শেষ দশ দিন তীব্র আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যে কাটান এবং অনেক সময় ধারদেনা করে সংসার চালাতে বাধ্য হন। এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির পেছনে বিগত রাজনৈতিক সরকারের চরম অবহেলা ও ভুল নীতিকে দায়ী করছেন দেশের স্বাধীন অর্থনীতিবিদেরা। ২০২১ সাল পর্যন্ত দেশের মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বৈশ্বিক বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। কিন্তু পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ হয় ওই বছরের আগস্টে। যখন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার হঠাৎ করে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এক ধাক্কায় ৪০ শতাংশের বেশি বাড়িয়ে দেয়। তখনই মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় এবং তৎকালীন নীতিনির্ধারকেরা কেবল বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে এই অভ্যন্তরীণ সংকটকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। কোনো কার্যকর ও জোরালো পদক্ষেপ নেননি।

এর সাথে যুক্ত হয়েছিল তীব্র ডলার সংকট। যার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকে এবং আমদানিকৃত পণ্যের খরচ জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। তৎকালীন সরকার এই বড় অর্থনৈতিক সংকটকে অফিশিয়ালি স্বীকৃতি না দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। এমনকি সরকারিভাবে মূল্যস্ফীতি ৭-৮ শতাংশ দেখানো হলেও বাস্তবে তা অনেক বেশি ছিল বলে অর্থনীতিবিদেরা অভিযোগ করেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে প্রকৃত তথ্য সামনে আসে। দেখা যায়। ওই বছরের জুলাইয়ে দেশের প্রকৃত মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ১২ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশ পার হয়ে গিয়েছিল। যা ছিল বিগত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর বর্তমান প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ। ব্যাংকের সুদের হার বৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের শুল্ক কমানোর ফলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে সাড়ে ৮ শতাংশে নেমেছিল। কিন্তু বাজার সিন্ডিকেটের কারণে তা আবারও ৯ শতাংশের ওপরে উঠে টানা তিন মাস ধরে স্থিতিশীল রয়েছে।

এই অসহনীয় পরিস্থিতি থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে অর্থনীতিবিদেরা সরকারকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমত। যেহেতু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির ফলে বাজারে বাড়িভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে। তাই বেসরকারি খাতের সাধারণ শ্রমিক ও কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর জন্য মালিকপক্ষকে সরকারের পক্ষ থেকে আইনি ও প্রশাসনিক চাপ দিতে হবে। যেন ভারসাম্য বজায় থাকে। দ্বিতীয়ত। দেশের প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য চলমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডের আওতা আরও বাড়াতে হবে এবং প্রকৃত দুস্থ মানুষেরা যেন কোনো দুর্নীতি ছাড়া এই সুবিধা পান তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো। দেশের বড় বড় শহরের বাজার সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে সার্বিক বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের পক্ষ থেকে গোয়েন্দা নজরদারি ও কঠোর আইনগত তদারকি বহুগুণ বৃদ্ধি করতে হবে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category