• বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ০৫:৫৫ পূর্বাহ্ন
Headline

সাংসদদের কটুক্তি : আমির হামজার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব?

Reporter Name / ৬০ Time View
Update : শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬

কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও ইসলামি বক্তা মুফতি আমির হামজা কর্তৃক দুই নারী সংসদ সদস্য—রুমিন ফারহানা ও ফারজানা শারমিনকে নিয়ে ‘বডি শেমিং’ এবং অশালীন মন্তব্যের বিষয়টি এখন জাতীয় সংসদের মূল আলোচনায় পরিণত হয়েছে। সংসদের বাইরের কোনো মাহফিলে দেওয়া বক্তব্যের জন্য একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে সংসদীয় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে আইনি ও সাংবিধানিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।

ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে আমির হামজাকে জনৈক এক মাহফিলে বলতে শোনা যায়, সংসদে তার বসার জায়গার ডানে-বামে থাকা নারী সদস্যদের শারীরিক গঠন ও ‘ভুঁড়ি’ নিয়ে তিনি চরম কটূক্তি করেছেন। তিনি এমনকি উপহাসের ছলে মন্তব্য করেন যে, ওই নারী সদস্যদের দেখলে অন্য মহিলারাও লজ্জা পাবে। একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে সংসদের ভেতরকার পরিবেশ এবং নিজের নারী সহকর্মীদের নিয়ে এমন প্রকাশ্য কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত আপত্তিকর ও অশালীন হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।

সংসদে নিজের নারী সহকর্মীদের শারীরিক গঠন নিয়ে করা তার এই ‘বডি শেমিং’ এবং অবমাননাকর মন্তব্যকে ঘিরে সমালোচনার ঝড় বইছে। সহকর্মী সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা এবং প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিনের নাম উল্লেখ করে আমির হামজা যে কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করেছেন, তাকে ‘নীচ মানসিকতা’ ও ‘নারীবিদ্বেষী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

সংসদীয় আইনের পরিমণ্ডল ও স্পিকারের ক্ষমতা

বাংলাদেশের সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্যের আচরণের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সর্বোচ্চ এখতিয়ার স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির।

  • সংবিধানের ৭৮(৩) অনুচ্ছেদ: সংসদ সদস্যরা সংসদে প্রদত্ত কোনো বক্তব্য বা ভোটের জন্য আদালতের কাছে দায়বদ্ধ নন (Immunity)। তবে সংসদের বাইরে করা মন্তব্য যদি অন্য সংসদ সদস্যের মানহানি করে বা সংসদের সামগ্রিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে, তবে তা ‘প্রাধিকার ভঙ্গ’ (Breach of Privilege) হিসেবে গণ্য হতে পারে।

  • তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা: স্পিকারের কাছে যদি কোনো সদস্য আনুষ্ঠানিক নোটিশ প্রদান করেন, তবে স্পিকার বিষয়টি তদন্তের জন্য ‘কার্যপ্রণালী কমিটি’ বা বিশেষ কমিটিতে পাঠাতে পারেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ওই সদস্যের সদস্যপদ স্থগিত বা এমনকি বহিষ্কারের সুপারিশ করার নজিরও সংসদীয় গণতন্ত্রে রয়েছে।

সংসদে রুমিন ফারহানার দাবি ও চিফ হুইপের বক্তব্য

বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) সংসদে রুমিন ফারহানা আমির হামজার বক্তব্যকে ‘কদাকার ও কুৎসিত’ আখ্যা দিয়ে বিচার দাবি করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, নিয়ম অনুযায়ী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা যদি একটি আনুষ্ঠানিক নোটিশ প্রদান করেন, তবে সংসদীয় কমিটি বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় এমন যেকোনো আচরণের বিচার করার সুযোগ স্পিকারের রয়েছে।

সুশীল সমাজ ও জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান

নারী অধিকার নেত্রী খুশি কবীর এই ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, এটি কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং একজন আইনপ্রণেতার নারীবিদ্বেষী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার জানিয়েছেন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও সংসদ সদস্যের অশোভন আচরণের জন্য বহিষ্কারের উদাহরণ রয়েছে। তাই সংসদের মর্যাদা রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

অন্যদিকে, আমির হামজার দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই ঘটনায় কিছুটা বিব্রত। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছেন, আমির হামজাকে ভবিষ্যতে কথা বলার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়ার জন্য দলের পক্ষ থেকে মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পরবর্তী ধাপ কী হতে পারে?

১. তদন্ত কমিটি: রুমিন ফারহানার নোটিশের ভিত্তিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হতে পারে।

২. ভিডিও যাচাই: ভাইরাল হওয়া ভিডিওটির সত্যতা এবং বক্তব্যের প্রেক্ষাপট যাচাই করা হবে।

৩. শাস্তি: অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী তাকে তিরস্কার করা হতে পারে, নির্দিষ্ট মেয়াদে সংসদ থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে অথবা তার সংসদ সদস্যপদ বাতিলের মতো কঠোর সিদ্ধান্তও আসতে পারে (যদি তা নৈতিক স্খলন হিসেবে প্রমাণিত হয়)। দুই নারী সংসদ সদস্যকে কটূক্তির দায়ে মুফতি আমির হামজার বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তি হতে পারে, তা বাংলাদেশের সংবিধান এবং জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি (Rules of Procedure) অনুযায়ী কয়েকটি ধাপে বিশ্লেষণ করা সম্ভব। সংসদীয় গণতন্ত্রে একজন সদস্যের অশোভন আচরণের জন্য শাস্তির মাত্রা অপরাধের ধরন ও তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে।

আমির হামজার সম্ভাব্য শাস্তির প্রক্রিয়া ও ধরণগুলো নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:

১. সংসদীয় কমিটির তদন্ত ও ‘তিরস্কার’ (Admonition or Reprimand)

যদি স্পিকারের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (Privilege Motion) জমা পড়ে, তবে তিনি সেটি ‘প্রাধিকার কমিটি’ (Committee of Privileges)-এর কাছে পাঠাবেন। কমিটি তদন্ত করে যদি দেখে যে আমির হামজার বক্তব্য সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছে, তবে তাকে:

  • সংসদ কক্ষে সশরীরে উপস্থিত হয়ে স্পিকারের সামনে দাঁড়িয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হতে পারে।

  • স্পিকার তাকে কঠোরভাবে সতর্ক (Warning) করতে পারেন অথবা ‘তিরস্কার’ করতে পারেন, যা সংসদের রেকর্ডে স্থায়ীভাবে থেকে যাবে।

২. সংসদ থেকে সাময়িক বহিষ্কার (Suspension)

কার্যপ্রণালী বিধির ১৭৪ ও ১৭৫ বিধি অনুযায়ী, কোনো সদস্যের আচরণ যদি অত্যন্ত ‘অশোভন’ বা ‘উচ্ছৃঙ্খল’ হয়, তবে স্পিকার তাকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সংসদ থেকে বহিষ্কার করতে পারেন।

  • অধিবেশন থেকে বহিষ্কার: চলতি অধিবেশনের বাকি দিনগুলোর জন্য তার সংসদীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ স্থগিত করা হতে পারে।

  • সুবিধা প্রত্যাহার: সাময়িক বহিষ্কার থাকাকালীন তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে প্রাপ্য দৈনিক ভাতা বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

৩. সংসদ সদস্যপদ বাতিল (Vacation of Seat)

এটি সবচেয়ে কঠোর শাস্তি। সংবিধানের ৬৬ ও ৬৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কয়েকটি বিশেষ পরিস্থিতিতে সদস্যপদ শূন্য হতে পারে:

  • নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধ: যদি দুই নারী সংসদ সদস্য আমির হামজার বিরুদ্ধে বাইরে মানহানির মামলা করেন এবং সেই মামলায় তার ২ বছর বা তার বেশি কারাদণ্ড হয়, তবে সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার সংসদ সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।

  • অযোগ্যতা ঘোষণা: সংসদ যদি মনে করে তার এই বক্তব্য ‘ঘোরতর অনৈতিক’ এবং এটি সংসদ সদস্য হিসেবে থাকার অযোগ্যতা তৈরি করেছে, তবে বিশেষ প্রস্তাবের মাধ্যমে ভোটাভুটির ভিত্তিতে তার সদস্যপদ বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে (যদিও এটি বিরল)।

৪. দলীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা

যেহেতু আমির হামজা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের (বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী) প্রতিনিধি, তাই সংসদীয় শাস্তির বাইরেও দলগতভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে:

  • দল থেকে বহিষ্কার: দল যদি মনে করে তার বক্তব্যের দায়ভার দল নেবে না, তবে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করতে পারে।

  • অব্যাহতি: দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে (ইতোমধ্যেই তাকে সতর্ক করার খবর পাওয়া গেছে)।

৫. ডিজিটাল নিরাপত্তা বা সাইবার আইনের আওতায় বিচার

যেহেতু কটূক্তিমূলক বক্তব্যটি ভিডিও আকারে ইন্টারনেটে ছড়িয়েছে, তাই ভুক্তভোগী সংসদ সদস্যরা চাইলে সাইবার নিরাপত্তা আইন (বা তৎকালীন প্রচলিত আইন) অনুযায়ী মামলা করতে পারেন। সংসদ সদস্য হওয়ার কারণে তিনি সংসদীয় এলাকায় ‘প্রিভিলেজ’ পেলেও ব্যক্তিগতভাবে মানহানিকর বক্তব্যের জন্য দেওয়ানি বা ফৌজদারি আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে বাধা নেই।

আইনজ্ঞদের মতে, এই ইস্যুটি বাংলাদেশের সংসদীয় সংস্কৃতিতে নারী সদস্যদের সম্মান রক্ষার ক্ষেত্রে একটি এসিড টেস্ট হিসেবে কাজ করবে। স্পিকার শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেন, তার ওপরই নির্ভর করছে এমপি আমির হামজার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category