• সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ০৩:১৩ অপরাহ্ন

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বাজেটের বড় অংশই যাচ্ছে অপদরিদ্রদের বাইরে

Reporter Name / ৩ Time View
Update : সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬

দেশের দরিদ্র, অতি-দরিদ্র এবং নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর মৌলিক সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতি বছর জাতীয় বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী (Social Safety Net) খাতে একটি বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এই খাতের মোট বরাদ্দের একটি বিশাল অংশই প্রকৃত দরিদ্রদের কল্যাণে ব্যয় হবে না। সরকারের অর্থ বিভাগের এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটের প্রায় ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ অর্থই ব্যয় হবে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি খাতের ভর্তুকি মেটাতে। ফলে কাগজের কলমে সামাজিক নিরাপত্তার বাজেটকে অনেক বড় এবং আকর্ষণীয় করে দেখানোর একটি চেনা প্রবণতা লক্ষ্য করা গেলেও, প্রকৃত অর্থে দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচিগুলোর ঝোলা বেশ শূন্যই রয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধরণের জগাখিচুড়ি কাঠামোর কারণে সামাজিক নিরাপত্তার মূল উদ্দেশ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতের জন্য মোট ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ১৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেশি। এই বিশাল বরাদ্দ দেশের মোট জিডিপির ২.১ শতাংশ এবং সামগ্রিক প্রস্তাবিত বাজেটের প্রায় ১৫ দশমিক ৩৯ শতাংশের সমান। তুলনামূলকভাবে, চলতি অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল জিডিপির ২.০২ শতাংশ বা মোট বাজেটের ১৬.০৪ শতাংশ। তবে বরাদ্দ বাড়লেও এই বিশাল তহবিলের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে অপদরিদ্রদের খাতে। যেমন, নতুন বাজেটে কৃষি ভর্তুকির জন্য আগের বছরের মতোই ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন ব্যবস্থাপনার জন্য ৩৫ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা এই সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ভেতরেই অন্তর্ভুক্ত করে দেখানো হয়েছে।

অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সরকারি পেনশন এবং কৃষি খাতের বড় ভর্তুকিকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অংশ হিসেবে দেখানো কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (SANEM)-এর নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান এই বিষয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলেছেন, সামাজিক সুরক্ষার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে সমাজ ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া অরক্ষিত জনগোষ্ঠীকে প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রীয় সহায়তা দেওয়া। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, রাষ্ট্রের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন সুবিধাকে সামাজিক সুরক্ষার বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একইভাবে কৃষকদের দেওয়া উৎপাদন ভর্তুকিকে এই সুরক্ষার হিসাবের ভেতর টেনে আনাও এক ধরণের শুভঙ্করের ফাঁকি, যা বাজেটের প্রকৃত চরিত্রকে আড়াল করে।

অতীতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা কৃত্রিমভাবে বড় করতে সঞ্চয়পত্রের সুদ পরিশোধ এবং কাগজ-কলমনির্ভর বিভিন্ন ব্লক বরাদ্দকেও এর ভেতরে ঢুকিয়ে রাখা হতো। যার ফলে এই খাতের অধীনে কর্মসূচির সংখ্যা এক সময় ১৪৫টিতে গিয়ে ঠেকেছিল। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় ক্রমান্বয়ে এই ত্রুটিপূর্ণ কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। গত অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের সুদকে এই খাত থেকে আলাদা করে কর্মসূচির সংখ্যা ৯৫টিতে নামিয়ে আনা হয়েছিল। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এটি আরও কমিয়ে ৯০টিতে নামানো হয়েছে এবং অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী বছরগুলোতে এর সংখ্যা আরও কমিয়ে এনে প্রকৃত জনবান্ধব কাঠামো তৈরি করা হবে। বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, কেবল নিম্নআয়ের সরকারি কর্মচারীদের প্রাপ্ত পেনশনটুকুই এই বাজেটে রাখা হয়েছে।

বাজেটের মোট ৯০টি কর্মসূচির মধ্যে মাত্র ৪৮টি কর্মসূচিকে সরাসরি দরিদ্রবান্ধব (Pro-poor) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৫৬ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ, মোট সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটের ৪০ শতাংশেরও কম অর্থ সরাসরি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় পৌঁছাবে। অবশ্য বিগত অর্থবছরের তুলনায় দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচির সংখ্যা ৩৮টি থেকে বাড়িয়ে ৪৮টি এবং বরাদ্দ ৩৯ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৬ হাজার ২২৯ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা ইতিবাচক। এই দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচির মধ্যে সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিফলন হিসেবে আনা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা পরিবার কার্ড কর্মসূচি। এই একটি প্রকল্পেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটের প্রায় ৯.৭ শতাংশ। এই কার্ডের মাধ্যমে দেশের প্রায় ৪১ লাখ দরিদ্র পরিবারকে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া হবে। তবে দ্বৈত সুবিধাভোগী বা একই পরিবার যেন বারবার সরকারি সুবিধা না পায়, সেজন্য অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ নামক একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ তৈরি করছে। এর ফলে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য নির্বাচিত ব্যক্তিরা অন্য কোনো সরকারি সামাজিক সুবিধা ভোগ করতে পারবেন না।

এর পাশাপাশি কৃষকদের জন্য আরেকটি বড় উদ্যোগ হিসেবে রয়েছে বিএনপির ‘ফার্মার্স কার্ড’ বা কৃষক কার্ড কর্মসূচি। এর আওতায় ৪২.৫ লাখ প্রান্তিক কৃষককে বছরে ২,৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে, যার জন্য সরকারের মোট ১,৪০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এছাড়া বিগত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে বাজেটে। আন্দোলনে গুরুতর আহত ১৬,৫১৩ জন ভুক্তভোগীকে আঘাতের তীব্রতা অনুযায়ী তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে প্রতি মাসে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা ও জীবনযাপনের জন্য বিশেষ ভাতা দেওয়া হবে। একই সাথে জুলাই বিপ্লবের ৮৪৪ জন বীর শহীদের পরিবারকে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা করে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা সম্মানী ভাতা প্রদান করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের সকল ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের জন্য মাসিক সম্মানী ও উৎসব ভাতা দেওয়ার আরেকটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এই বাজেটে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে এই সুবিধার আওতায় আসছেন প্রায় ২.৬ লাখ ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিত, বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং মন্দির, গির্জা ও মঠের কেয়ারটেকাররা। এছাড়াও ‘ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং’ বা ভিজিএফ (VGF) কর্মসূচির অধীনে একটি সমন্বিত নীতির মাধ্যমে দেশের ১৫ লাখ দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের মাঝে নগদ অর্থ বিতরণ করা হবে, যা প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টন চালের সমপরিমাণ। কর্মসংস্থান হারানো বা বেকার হয়ে পড়া ১৫ হাজার শ্রমিকের জন্য প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা করে সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত একটি বিশেষ বেকার ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যার মোট বাজেট ২৫ কোটি টাকা।

বিদ্যমান নিয়মিত সামাজিক কর্মসূচির ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। বয়স্ক ও বিধবা ভাতার সুবিধাভোগীর সংখ্যা আরও ১ লাখ করে বাড়ানো হচ্ছে। তবে ভাতার পরিমাণ মাত্র ৫০ টাকা বাড়িয়ে প্রতি মাসে ৬৫০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বর্তমান বাজারদরের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। বর্তমানে দেশে ৬১ লাখ মানুষ বয়স্ক ভাতা এবং ২৯ লাখ নারী বিধবা ভাতা পাচ্ছেন। প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ ১০০ টাকা বাড়িয়ে প্রতি মাসে ১,০০০ টাকা করা হচ্ছে এবং এর উপকারভোগীর সংখ্যা আরও আড়াই লাখ বাড়িয়ে ৩৮ লাখে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপবৃত্তি ১,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৪০০ টাকা এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির সুবিধাভোগীর সংখ্যা আরও ১ লাখ বাড়ানো হলেও তাদের মাসিক ভাতার পরিমাণ আগের মতোই ৮৫০ টাকা রাখা হয়েছে। ক্যান্সার, কিডনি এবং লিভারের মতো মারাত্মক ও ব্যয়বহুল রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় চিকিৎসা সহায়তার বাজেট বাড়িয়ে ৭০০ কোটি টাকা করা হয়েছে এবং ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ সহায়তার সীমা ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে সুবিধাভোগীর সংখ্যা ও মূল ভাতা অপরিবর্তিত থাকলেও বীর শ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক—এই চার খেতাবধারী মোট ৫৮৯ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার মাসিক সম্মানী ভাতা আরও ৫,০০০ টাকা করে বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

সামগ্রিক বাজেট মূল্যায়ন করতে গিয়ে অধ্যাপক সেলিম রায়হান মন্তব্য করেছেন, আগামী অর্থবছরের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিটি মৌলিক কোনো পরিবর্তনের চেয়ে কেবলই পরিধি বিস্তারের একটি প্রশাসনিক চেষ্টা মাত্র। বাজেট প্রতিবেদনে সঠিক সমস্যাগুলো—যেমন কর্মসূচির বিচ্ছিন্নতা, ভুল লক্ষ্য নির্ধারণ, শহুরে দরিদ্রদের অবহেলা, জলবায়ু ঝুঁকি এবং কর্মসংস্থানের সাথে দুর্বল সংযোগের বিষয়গুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু এর সমাধান হিসেবে এখনো পুরোনো আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ওপরই অতিরিক্ত ভরসা করা হচ্ছে, যেখানে বহু মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যে কাজের সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নতুন কার্ড বিতরণ বা স্লোগান দেওয়ার চেয়ে সরকারি এই সুবিধার প্রকৃত বন্টন, স্বচ্ছতা, ভাতার পর্যাপ্ততা এবং সামাজিক সুরক্ষাকে দয়া-দাক্ষিণ্যের বদলে নাগরিকদের আইনি অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপরই এই বাজেটের চূড়ান্ত সফলতা নির্ভর করছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় দেশের এই জরাজীর্ণ অবস্থার কথা স্বীকার করে বলেছেন, “দেশে বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা সমসাময়িক অর্থনৈতিক চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত নয় এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসইও নয়।” তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বর্তমান সরকার প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে একটি সমতাভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কল্যাণমূলক কাঠামো গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই উদ্দেশ্যে মানুষের জীবনের জন্ম থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি স্তরকে একটি সুনির্দিষ্ট ‘জীবন-চক্র পদ্ধতি’ বা লাইফ-সাইকেল অ্যাপ্রোচের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষার বলয়ে নিয়ে আসা হবে। অর্থমন্ত্রী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, সরকারের মূল দর্শনই হচ্ছে নাগরিকদের কেবল পরনির্ভরশীল না রেখে ‘অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও স্বাবলম্বিতা’ অর্জনে সহায়তা করা, যেন প্রতিটি নাগরিক শেষ পর্যন্ত নিজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা ফিরে পান।

তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category