• মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪০ অপরাহ্ন

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থ এক বছরে বিপুল বৃদ্ধি

Reporter Name / ১ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত রাখা অর্থের আমানত হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বাংলাদেশিদের জমা করা মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) সম্প্রতি তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর এই চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে। প্রকাশিত পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০২৫ বছর শেষে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁয়। এর ঠিক আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে এই তহবিলের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ। বর্তমান আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারের বিনিময় হার অনুযায়ী, প্রতি সুইস ফ্রাঁ প্রায় ১৫২ থেকে ১৫৩ টাকার সমতুল্য। সেই হিসাবে দেশীয় মুদ্রায় ২০২৫ সাল শেষে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমানো অর্থের মোট অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা, যা বিগত কয়েক বছরের মধ্যে নজিরবিহীন।

সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২১ সালের পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালেই সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকিং খাতে বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে। যদি বিগত এক দশকের পরিসংখ্যান বিবেচনা করা হয়, তবে আমানতের এই পরিমাণটি গত দশ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। উল্লেখ্য যে, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে দুই উপায়ে অর্থ জমা রাখা হয়— ব্যক্তি পর্যায়ে এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের নামে। এর মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক বৈধ উপায়ে বৈদেশিক বাণিজ্যের স্বার্থে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে অর্থ গচ্ছিত রাখে। পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও তাদের নিজস্ব আমানত সুইস ব্যাংকে জমা করেন। বৈশ্বিক আর্থিক নীতি অনুযায়ী সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে অন্যান্য দেশ থেকে আসা এই সামগ্রিক অর্থকে তাদের নিজস্ব দায় হিসেবে হিসাবভুক্ত করে। ফলে সংশ্লিষ্ট খাতে জমা হওয়া সমস্ত অর্থই অবৈধ উপায়ে পাচার করা হয়েছে— এমনটি ঢালাওভাবে বলা সম্ভব নয়।

তবে আমানতের বিপুল বৃদ্ধির এই খবরটি দেশের অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর চিন্তার সৃষ্টি করেছে। এর কারণ হলো ২০২২ এবং ২০২৩ সালে পরপর দুই বছর সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ আশাব্যঞ্জকভাবে কমে গিয়েছিল। ওই সময়ে আমানতের পরিমাণ নেমে এসেছিল যথাক্রমে সাড়ে পাঁচ কোটি এবং পৌনে দুই কোটি সুইস ফ্রাঁয়। দুই বছরের সেই নিম্নমুখী প্রবণতা পার হয়ে হঠাৎ করেই আমানত এক লাফে এত উঁচুতে উঠে যাওয়া মোটেও স্বাভাবিক লক্ষণ নয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মইনুল ইসলাম এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে মন্তব্য করেছেন যে, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও তৎকালীন সরকারের পতনের পর দেশ থেকে অবৈধ উপায়ে অর্থ পাচারের হার হ্রাস পাবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু সুইস ব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত এই আর্থিক প্রতিবেদন স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের লাগাম এখনো টানা সম্ভব হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, পাচার হওয়া অর্থ কেবল সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা বিশ্বের বিভিন্ন অফশোর আর্থিক কেন্দ্র ও দেশে স্থানান্তরিত হয়। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের পর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ী দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের দেশে থাকা বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ বা বাজেয়াপ্ত করা হয়। এই পরিস্থিতিতে তাঁদের অনেকেই নিজেদের আর্থিক নিরাপত্তা রক্ষার্থে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ব্যাংক হিসাব স্থানান্তরের কৌশল হিসেবে অর্থ সুইস ব্যাংকে পাঠিয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাছাড়া বিগত আমলের সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্রেও দেশ থেকে কোটি কোটি ডলার পাচারের যেসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠেছিল, সেই সব অর্থের একটি বড় অংশও ঘোরাপথে সুইস ব্যাংকের ভল্টে গিয়ে জমা হতে পারে।

অতীতে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংক ব্যবস্থা অর্থ পাচারকারীদের অন্যতম প্রধান ও নিরাপদ স্বর্গরাজ্য হিসেবে বিবেচিত হতো। কারণ সুইজারল্যান্ডের কঠোর গোপনীয়তা আইনের কারণে তারা গ্রাহকদের কোনো ধরণের তথ্য বা পরিচয় অন্য দেশের সরকারের কাছে প্রকাশ করতো না। তবে আন্তর্জাতিক আর্থিক চুক্তি এবং বৈশ্বিক চাপ ও কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে সুইস ব্যাংকগুলোর সেই গোপনীয়তার প্রাচীর অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। তারা এখন বিভিন্ন দেশের আইনগত চাহিদার প্রেক্ষিতে সীমিত পরিসরে আর্থিক তথ্য আদান-প্রদান করতে বাধ্য হয়। তবুও বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নতুন সরকার কীভাবে এই পাচার বন্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং পূর্বের পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে বিশ্বমঞ্চে আইনি উদ্যোগ নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪, প্রথম আলো


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category