• সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:১২ অপরাহ্ন

হঠাৎ ‘র’ বাংলাদেশে কেন?

Reporter Name / ০ Time View
Update : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জটিল টানাপোড়েন নিরসনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে ভারতের পরাক্রমশালী বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং)-এর শীর্ষ নেতৃত্বের আকস্মিক ঢাকা সফর। চীন সফর শেষে গত রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল নিয়ে গোপনে ঢাকা পৌঁছেছেন ‘র’-এর বর্তমান সেক্রেটারি পরাগ জৈন। সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন অশ্বীন মুকুন্দ কোটনিস, রাহুল নেগি ও শৈবাল রায় চৌধুরীর মতো প্রভাবশালী উর্ধতন কর্মকর্তারা। বাংলাদেশের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্সের (ডিজিএফআই) প্রাতিষ্ঠানিক আমন্ত্রণে আসা এই সফরটি বাইরে থেকে প্রথাগত কূটনৈতিক আদান-প্রদান মনে হলেও, বস্তুত এটি ঢাকা ও দিল্লির দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বরফ জমা অচলাবস্থা কাটানোর এক অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রয়াস।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক রূপান্তরের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং সেখান থেকে তার বক্তব্য ও আইনি জটিলতাকে কেন্দ্র করে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক টানাপোড়েন চরম রূপ ধারণ করেছিল। ঠিক এমন এক নাজুক মুহূর্তে নিরাপত্তা ও নীতি-নির্ধারণী স্তরে সরাসরি যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করতেই এই গোপন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সফর নিয়ে ঢাকা কিংবা দিল্লি—কোনো পক্ষের কূটনৈতিক নথিতে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য প্রকাশ করা না হলেও ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে অবস্থানরত এই প্রতিনিধি দলের আলোচনার টেবিলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ঢাকা যেখানে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে আইনি বিচারের মুখোমুখি করতে স্বদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে নিজেদের অনড় অবস্থান বজায় রেখেছে, সেখানে ভারতের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করে নিরাপদ সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে।
একই দিনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর মধ্যকার অত্যন্ত গভীর ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা সফরটিকে ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে আরও বেশি অর্থবহ করে তুলেছে। এক দৃশ্যপটে হাইকমিশনার যেখানে দ্বিপাক্ষিক জনগণের মেলবন্ধন, অভিন্ন অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সংস্কৃতির বাণী তুলে ধরছেন, ঠিক তার উল্টো পিঠে ‘র’ প্রধানের এই গোপন সফর সামাল দিচ্ছে পর্দার আড়ালের জটিল সামরিক ও জাতীয় নিরাপত্তার সমীকরণ। বিশেষ করে আঞ্চলিক রাজনীতিতে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নতুন সামরিক ও অর্থনৈতিক অক্ষের আত্মপ্রকাশ এবং ভারতের ভৌগোলিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ইস্যুতে দিল্লি বর্তমানে চরম সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এই জটিল সমীকরণে ভারতের নিরাপত্তার অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে ঢাকার কৌশলগত সহযোগিতা দিল্লির জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
এ ছাড়াও, বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক নিরাপত্তা, অনিয়মিত সীমান্ত হত্যা রোধ এবং মিয়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে আসা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের মতো জটিল বিষয়গুলোতে উভয় দেশের সুনির্দিষ্ট সামরিক ও গোয়েন্দা সমঝোতার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। প্রথাগত পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রোটোকল কিংবা শিষ্টাচারের বাইরে গিয়ে গোয়েন্দা প্রধানের এই সশরীরে গোপন উপস্থিতি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশকে কেবল সাধারণ কোনো প্রতিবেশী হিসেবে নয়, বরং ভারতের সার্বিক আন্তর্জাতিক সীমান্ত নিরাপত্তার মূল নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করে দিল্লি। গত আগস্টের পটপরিবর্তনের পর প্রকাশ্যে যে দ্বিপাক্ষিক তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছিল, তা কাটিয়ে দুটি দেশের জন্যই একটি কৌশলগত ‘উইন-উইন’ বা জয়-জয় পরিস্থিতি নিশ্চিত করাই এই আকস্মিক সফরের প্রধান লক্ষ্য। পর্দার পেছনের এই রুদ্ধদ্বার সামরিক ও কূটনৈতিক সংলাপ বরফ জমা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তনের নতুন বাতাস বয়ে আনে, এখন সেটাই বৈশ্বিক রাজনীতি পর্যবেক্ষকদের প্রধান দেখার বিষয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category