সারাদেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব। কিন্তু এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও রোগ শনাক্তকরণের পুরো প্রক্রিয়াটি আটকে আছে মাত্র একটি ল্যাবে। ঢাকার জাতীয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (IPH) ওপর পুরো দেশের নির্ভরতা একদিকে যেমন পরীক্ষার চাপ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ফলাফল পেতে দেরি হওয়ার কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত শনাক্তকরণ ও আইসোলেশন নিশ্চিত করা না গেলে এই ছোঁয়াচে রোগটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলা এবং প্রতিটি উপজেলা থেকে হামের উপসর্গযুক্ত রোগীদের নমুনা পাঠানো হচ্ছে ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে। জেলা-উপজেলা পর্যায় থেকে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক স্যাম্পল আসায় ল্যাবের সক্ষমতা হিমশিম খাচ্ছে। যদিও ল্যাবটি ছুটির দিনেও সচল রাখা হয়েছে, তবুও সারাদেশের ভার একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানের ওপর হওয়ায় রিপোর্ট পেতে সময় লাগছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস জানিয়েছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠান। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসকরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। নিয়মিত রিপোর্ট না আসায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত তিন মাসে নমুনার সংখ্যা এবং শনাক্তের হার জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। জানুয়ারিতে মাত্র ৩৮০টি নমুনা এসেছিল, যার মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছিল ৫১ জনের। ফেব্রুয়ারিতে নমুনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬০টি এবং শনাক্ত হয় ১৫০ জন। কিন্তু মার্চ মাসে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়—নমুনা আসে ১ হাজার ১৯০টি এবং শনাক্ত হয় ৪৬৪ জন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিগত বছরগুলোতে হাম শনাক্তের হার ছিল মাত্র ১ থেকে ৫ শতাংশ। অথচ এ বছর সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে। ল্যাবের ভাইরোলজিস্টরা জানিয়েছেন, হুট করে আক্রান্তের সংখ্যা কেন বাড়ল এবং ভাইরাসের ভেরিয়েন্টে কোনো পরিবর্তন আছে কিনা, তা নিয়ে বর্তমানে গবেষণা চলছে।
গত ২৪ ঘণ্টার (৪ এপ্রিল থেকে ৫ এপ্রিল সকাল) পরিসংখ্যান দেশজুড়ে শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে। এই সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গে ১০ জন এবং ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হামে ২ জনসহ মোট ১২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে ৯৭৪ জন শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৩৯২ জনের মধ্যে উপসর্গ দেখা গেছে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনায় পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতিশীল। গত ১৫ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ২০ দিনে ৭ হাজার ৬১০ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে ১১৩ জন প্রাণ হারিয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক। একজন আক্রান্ত শিশু অজান্তেই অনেককে সংক্রমিত করতে পারে। যদি পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে ৭২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় লাগে, তবে সেই সময়ের মধ্যে আক্রান্ত শিশুটি আরও অনেকের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়।
জাতীয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের বায়োকেমিস্ট ডা. রাশেদা ইয়াসমিন স্বীকার করেছেন যে, আগে এক মাসে যে পরিমাণ নমুনা আসত, এখন একদিনে সেই পরিমাণ নমুনা আসছে। এই প্রবল চাপের কারণে রিপোর্ট দিতে দেরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল একটি কেন্দ্রীয় ল্যাবের ওপর নির্ভর না করে অতিদ্রুত আঞ্চলিক পর্যায়ে (যেমন—বিভাগীয় শহরগুলোতে) পিসিআর ল্যাব স্থাপন করা জরুরি। এছাড়া টিকাদান কর্মসূচির সীমাবদ্ধতাগুলোও দ্রুত চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
মোট মৃত্যু (উপসর্গসহ)
১১৩ জন
হাসপাতালে ভর্তি (উপসর্গ নিয়ে)
৭,৬১০ জন
শনাক্তের বর্তমান হার
৩০% – ৩৫%
২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী (উপসর্গ)
৯৭৪ জন