বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে কি শেষ পর্যন্ত ঢাকার হাতে তুলে দেবে দিল্লি? নাকি ভারত আইন, কূটনীতি আর সময়ের আড়ালে নিজস্ব কোনো কৌশলে হাঁটছে? গত ৮ এপ্রিল দিল্লিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বৈঠকের পর এই প্রশ্নটিই এখন দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।
বাংলাদেশের সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘বাসস’ (BSS) দাবি করেছে, দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান কামালকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ আবারও জানানো হয়েছে। ঢাকার যুক্তি অত্যন্ত স্পষ্ট—এটি কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়। তারা বলছেন, যেহেতু তারা আদালতের রায়ে দণ্ডিত এবং অভিযুক্ত, তাই কোনো রাষ্ট্র যদি মনে করে তার দণ্ডিত নাগরিক অন্য দেশে অবস্থান করছেন, তবে তাকে ফেরত চাওয়াটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও আইনি প্রক্রিয়া। এই জায়গা থেকে বাংলাদেশের দাবিকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের দাবি যতটা সোজা, দিল্লির সিদ্ধান্ত নেওয়া ততটাই জটিল। ভারতকে এখানে কয়েকটি দিক একসাথে ভাবতে হচ্ছে: ১. প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty): ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও এর মধ্যে ‘রাজনৈতিক অপরাধ’ সংক্রান্ত কিছু ধারা রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। ২. কূটনৈতিক বার্তা: ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর থেকেই তাঁর ভারতে অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে এক অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত এখন পর্যন্ত হাসিনা বা কামালকে নিয়ে কোনো চূড়ান্ত বা স্পষ্ট অবস্থান প্রকাশ্যে জানায়নি। দিল্লি যদি খুব দ্রুত তাঁদের ফেরত দিতে চাইত, তবে কর্মকর্তাদের ভাষায় অন্তত কিছুটা আভাস থাকত। কিন্তু দিল্লির বর্তমান নীরবতা একটি বিশেষ সংকেত দিচ্ছে।
কূটনীতিতে কোনো প্রশ্নই এককভাবে কাজ করে না। একদিকে যখন হাসিনা-কামাল ইস্যু নিয়ে চাপ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে কিন্তু ভিসা সহজীকরণ, ডিজেল সরবরাহ এবং সারের মতো বাণিজ্যিক বিষয়গুলোও আলোচনায় আসছে। এটিই হলো ‘দরকষাকষি’ বা বার্গেইনিং চিপ।
ঢাকা দেখাতে চাইছে তারা দেশের মানুষের সেন্টিমেন্টের প্রতি দায়বদ্ধ এবং কঠিন প্রশ্নগুলো দিল্লির সামনে তুলছে।
দিল্লি চাইছে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে, যাতে করে বড় কোনো ইস্যুতে ছাড় দেওয়ার বিনিময়ে অন্য কোনো কৌশলগত সুবিধা পাওয়া যায়।
এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া অসম্ভব। এখনই যদি কেউ বলে ভারত ফেরত দেবে, তবে সেটা বাড়াবাড়ি হবে। আবার যদি বলা হয় কখনোই দেবে না, সেটাও হবে ভুল।
যদি ফেরত দেয়: তবে সেটি হবে এক বিশাল রাজনৈতিক বার্তা, যা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করবে।
যদি না দেয়: তবে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাসের দেয়াল আরও মজবুত হবে।
দিল্লি এখনই কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। তারা দেখছে আন্তর্জাতিক চাপ, আইনি বাধ্যবাধকতা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গতিপ্রকৃতি। ভারতের কাছে শেখ হাসিনা কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন, বরং দীর্ঘদিনের এক বিশ্বস্ত মিত্র। সেই মিত্রকে হুট করে তুলে দেওয়া ভারতের নিজস্ব কূটনীতির জন্য একটি ঝুঁকি হতে পারে। ফলে এই প্রত্যর্পণ যুদ্ধ যে দীর্ঘস্থায়ী একটি কূটনৈতিক ‘স্নায়ুযুদ্ধে’ পরিণত হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।
তথ্যসূত্র: বাসস, প্রথম কলকাতা ও কূটনৈতিক সূত্র (১০ এপ্রিল, ২০২৬)