• বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:০৯ অপরাহ্ন
Headline
লাইসেন্সপ্রাপ্ত মানি চেঞ্জারদের বৈদেশিক মুদ্রা জমায় নতুন সুবিধা রফতানি ও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক ধারা, রিজার্ভ ৩৬.২৫ বিলিয়ন ডলার সিটি গ্রুপকে ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ দিতে আইন শিথিল করল বাংলাদেশ ব্যাংক সিঙ্গাপুরে প্রশিক্ষণে যাচ্ছেন সচিব, অতিরিক্ত সচিবসহ ৩৫ সরকারি কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে চীনা মন্ত্রীর সাক্ষাৎ, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদারের আহ্বান ঋণ সহায়তার বাইরে কোরিয়ার সঙ্গে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব চায় বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর সৌরবিদ্যুৎ পরিকল্পনা ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্পপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে : মাহদী আমিন আর্টিলারি রেজিমেন্টের অধিনায়ক সম্মেলন ও পুনর্মিলনীতে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা আরও গভীর করতে চীনের অঙ্গীকার: লিউ মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে কাজ করবে সংসদীয় ককাস

১১ দলীয় জোটে ক্ষমতার টানাপোড়েন: জামায়াতকে চাপে রেখে নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি বাড়াতে চাইছে নাগরিক পার্টি

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গঠিত একাদশ দলীয় ঐক্যজোটের অন্দরে বড় ধরনের ফাটল ও মতপার্থক্য তৈরি হওয়ার খবর রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই জোটের অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী শক্তি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে কিছুটা চাপে রাখার সুনির্দিষ্ট কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছে শরিক দলগুলো, যার মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি অগ্রগণ্য। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে জোটগতভাবে সমঝোতার মাধ্যমে প্রার্থী দেওয়ার জোরালো দাবি শরিকরা তুললেও জামায়াত তাদের ঐতিহ্যগত ‘একলা চলো’ নীতি থেকে বিন্দুমাত্র সরে দাঁড়াতে নারাজ। এই দ্বিমুখী অবস্থানের কারণে দুই প্রধান শরিক দলের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এখন প্রকাশ্য রূপ নিতে শুরু করেছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিশেষ করে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী ঘোষণা করার পর থেকেই জামায়াত ও এনসিপির মধ্যকার এই দূরত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। এনসিপির পক্ষ থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জন্য নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং উত্তর সিটি করপোরেশনের জন্য আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নাম চূড়ান্ত করে প্রার্থিতা ঘোষণা করা হয়েছে। পক্ষান্তরে জামায়াতও ঢাকা দক্ষিণে ডাকসু ভিপি আবু সাদিক কায়েম এবং উত্তরে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনকে তাদের দলীয় প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামানোর ঘোষণা দিয়েছে। দুই দলের এই অনড় অবস্থানের ফলে সমঝোতার সমস্ত পথ একপ্রকার বন্ধ হয়ে গেছে এবং স্থানীয় নির্বাচনে তাদের মধ্যে যে ত্রিমুখী বা বহুমুখী লড়াই হবে তা এখন নিশ্চিত।

কেবল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনই নয়, বরং চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লার মতো দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় ও বড় শহরগুলোর স্থানীয় নির্বাচন নিয়েও দুই দলের মধ্যে কোনো ধরনের আসন সমঝোতা বা ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। জামায়াতের স্থানীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেহেতু সরাসরি দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হয় না, তাই তৃণমূলে নিজেদের দলের প্রকৃত সাংগঠনিক শক্তি, জনসমর্থন এবং নিজস্ব নেতৃত্ব যাচাই করার এটিই মোক্ষম সময়। এই যুক্তির ভিত্তিতেই তারা ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সদস্য থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশনের মেয়র পদ পর্যন্ত প্রতিটি স্থানে নিজেদের একক প্রার্থী চূড়ান্ত করার কাজ প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছে।

এর বিপরীতে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি এই স্থানীয় নির্বাচনকে কেবল সাধারণ কোনো প্রশাসনিক নির্বাচন হিসেবে দেখছে না, বরং এটিকে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সক্ষমতা ঝালাই করে নেওয়ার এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী কমিটি ও পোলিং এজেন্ট তৈরি করার সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছে। এনসিপির শীর্ষ নেতারা মনে করছেন যে দীর্ঘ সময় ধরে যদি তারা জামায়াতের রাজনৈতিক ছত্রছায়া বা নির্ভরতার ওপর পুরোপুরি আচ্ছন্ন হয়ে থাকেন, তবে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের স্বকীয়তা ও জনভিত্তি গড়ে তোলার প্রধান লক্ষ্য মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।

এই কৌশলগত দূরত্বের বহিঃপ্রকাশ কেবল নির্বাচনী মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সাম্প্রতিক বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও জনসভার মঞ্চেও তা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। রাজধানীর শাহবাগে জামায়াতকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে এনসিপির স্বাধীনভাবে গণবিক্ষোভ সমাবেশ করার ঘটনা এবং এর ঠিক পরের দিন ১১ দলীয় জোটের ঢাকা-খুলনা লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে দলটির শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যদিও পরবর্তীতে লংমার্চের বিভিন্ন পথসভায় এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা যোগ দিয়ে বক্তব্য রেখেছেন, তবুও উদ্বোধনী মঞ্চে অনুপস্থিতি এবং লংমার্চের মঞ্চে দাঁড়িয়েই জামায়াতের কঠোর সমালোচনা করে হাসনাত আবদুল্লাহ ও আসিফ মাহমুদের মতো তরুণ নেতাদের বক্তব্য দুই দলের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের ইঙ্গিত দিয়েছে।

জোটে থাকা সত্ত্বেও জামায়াতকে প্রকাশ্য সমালোচনা ও চাপে রাখার এই নীতি এনসিপির সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে সহায়তা করবে বলে দলটির নীতিনির্ধারকরা বিশ্বাস করেন। জোটের কর্মসূচিগুলোতে নিজেদের অংশগ্রহণ কিছুটা সীমিত করে দিয়ে এনসিপি এখন জেলা, মহানগর এবং থানা পর্যায়ে নিজস্ব দলীয় কর্মকাণ্ড ও জনসভা বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ মহানগর কমিটিসহ দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় শহরে বড় ধরনের রাজনৈতিক শোডাউন ও সমাবেশ করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

এদিকে ১১ দলীয় জোটের অভ্যন্তরীণ এই অস্বস্তির মাঝেই কওমি ঘরানার সমমনা দলগুলোকে নিয়ে হেফাজতে ইসলামের নতুন একটি রাজনৈতিক বা ধর্মীয় প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ এই ঐক্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং নেজামে ইসলাম পার্টির মতো শরিক দলগুলো এই নতুন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকায় ১১ দলীয় জোটের ওপর বাড়তি একটা রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও কওমি ঘরানার দলগুলোর ওপর পুরনো জোট ছেড়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে নানামুখী চাপ আসার অভিযোগ রয়েছে, তবুও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শীর্ষ নেতৃত্ব স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে তারা বর্তমান ১১ দলীয় ঐক্য বজায় রেখেই সামনের দিকে এগোতে চান।

জোটের অন্য শরিক দলগুলো মনে করছে যে জাতীয় সংসদ ও রাজপথের মূল আন্দোলনে বিরোধী দলগুলোর পারস্পরিক ঐক্য ও সংহতি যেমন অপরিহার্য, তেমনই স্থানীয় নির্বাচনেও একটি ন্যূনতম সুসমন্বয় থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল। বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরানসহ অন্যান্য শরিক নেতারা অবশ্য মনে করছেন যে এই ধরনের ছোটখাটো মতপার্থক্য বা দরকষাকষি বড় কোনো জোট ভেঙে যাওয়ার কারণ হতে পারে না, কারণ অতীতেও দীর্ঘ সময় ধরে তারা বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থে একসঙ্গে লড়াই করেছেন।

সব মিলিয়ে ১১ দলীয় জোটের অন্দরে জামায়াতকে চাপে রেখে নিজস্ব রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও আসন সমঝোতা আদায়ের যে কূটকৌশল এনসিপি গ্রহণ করেছে, তা আগামী দিনের দেশীয় রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিচ্ছে। জাতীয় ঐক্যের বৃহত্তর স্বার্থ বজায় রেখে স্থানীয় নির্বাচনের মাঠে দুই দলের এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক গন্তব্যে গিয়ে ঠেকে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

ভবিষ্যতের রাজনৈতিক দলগুলোর মেরুকরণ এবং জনসমর্থনের সঠিক চিত্র পেতে এই স্থানীয় সরকার নির্বাচন অত্যন্ত নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে রাজনৈতিক গবেষকরা মনে করছেন।

পরিশেষে বলা যায় যে আদর্শিক ঐক্য এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতার এই দ্বান্দ্বিক অবস্থান থেকে দলগুলো কীভাবে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখে, তার ওপরই নির্ভর করছে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।

তৃণমূলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতে এবং নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন করতে এই ধরনের স্বাধীন কৌশল অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হতে পারে।

আগামী দিনের জাতীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে মোড় নেবে, তার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাবে এই স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফল থেকে।

তাই সব পক্ষের বিচক্ষণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই কেবল এই অন্তর্বর্তীকালীন সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নজর রেখে দলগুলো তাদের পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণ করবে বলেই সকলের বিশ্বাস।

তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category