রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানিসহ নিত্যপণ্যের অব্যাহত ঊর্ধ্বগতিতে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম আট মাসেই (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৯১ কোটি ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি (প্রতি ডলার ১২২.৫০ টাকা হিসেবে)। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৩৭১ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট-বিওপি) সংক্রান্ত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ব্যবসায়ীরা মোট ৪ হাজার ৬১৭ কোটি (৪৬.১৪ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য আমদানি করেছেন। এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের (৪৩.৭৪ বিলিয়ন ডলার) তুলনায় ৫.৬ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, এই সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩ হাজার ৩ কোটি (৩০.০৩ বিলিয়ন) ডলার। অথচ গত অর্থবছরের এই সময়ে রপ্তানি ছিল ২৯.২৬ বিলিয়ন ডলার। শতাংশের হিসেবে আমদানির ব্যয় বাড়লেও রপ্তানি আয় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাণিজ্য ঘাটতির ওপর।
অর্থনীতিবিদদের মতে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে পবিত্র রমজানকে কেন্দ্র করে চিনি, ভোজ্যতেল, ছোলা, ডাল ও খেজুরের মতো নিত্যপণ্যের আমদানি অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়েছিল। বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের দাম চড়া থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার বড় একটি অংশ আমদানিতে ব্যয় হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে প্রধান রপ্তানি খাতগুলো থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আসার গতি ছিল মন্থর।
সাধারণত উন্নয়নশীল দেশের জন্য চলতি হিসাবের ভারসাম্য (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স) উদ্বৃত্ত থাকা ভালো। এটি নির্দেশ করে যে দেশটিকে নিয়মিত লেনদেনের জন্য ঋণ করতে হচ্ছে না। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বর্তমানে এটি ঋণাত্মক অবস্থানে রয়েছে।
চলতি হিসাব: ফেব্রুয়ারি শেষে চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটি ডলার। যদিও গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১৪৭ কোটি ডলার, অর্থাৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও দেশটি এখনও ঋণের ওপর নির্ভরশীল।
সামগ্রিক ভারসাম্য (Overall Balance): স্বস্তির বিষয় হলো সামগ্রিক ভারসাম্য বর্তমানে ৩৪৩ কোটি ডলার উদ্বৃত্ত রয়েছে। গত বছরের এই সময়ে এটি ১১৫ কোটি ডলার ঋণাত্মক ছিল। মূলত রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধি এই সূচকটিকে রক্ষা করেছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে প্রবাসীরা ২ হাজার ২৪৫ কোটি ডলারের রেকর্ড রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। আগের বছরের ১ হাজার ৮৮৭ কোটি ডলারের তুলনায় এটি ২১.৪ শতাংশ বেশি। এই রেমিট্যান্সই মূলত ভঙ্গুর অর্থনীতিকে বড় পতনের হাত থেকে আগলে রেখেছে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠে দেখা যাচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগের করুণ দশা। ১. এফডিআই: প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮৭ কোটি ডলারে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১০৬ কোটি ডলার। ২. শেয়ারবাজার: দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বা পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট এখন নেতিবাচক। প্রথম ৮ মাসে শেয়ারবাজার থেকে নিট ৮ কোটি ডলার বিদেশে চলে গেছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের বড় প্রমাণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অর্থনীতিকে স্বাভাবিক গতিতে ফিরিয়ে আনতে হলে কেবল রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি বিলাসজাত ও অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিতে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। একইসাথে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং শেয়ারবাজারের পরিবেশ উন্নয়ন করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্থিতিশীলতা আনা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ক্রমবর্ধমান এই ঘাটতি বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।