মধ্যপ্রাচ্যের পর বিশ্ব রাজনীতির পরবর্তী বৃহৎ সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হতে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটির ভেতরে চলমান গৃহযুদ্ধ এখন আর কেবল জান্তা সরকার ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি এখন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থ উদ্ধারের এক ভয়ংকর প্রক্সি ওয়্যারে (ছায়াযুদ্ধ) রূপ নিয়েছে। আর বঙ্গোপসাগরের তীরে মিয়ানমারের ঠিক পাশেই অবস্থিত হওয়ায় এই ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
মিয়ানমারকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের এত আগ্রহের মূল কারণ হলো চীনের কৌশলগত রুট আটকে দেওয়া। এশিয়া থেকে ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যে বাণিজ্যের জন্য চীনের প্রধান ভরসা ‘মালাক্কা প্রণালী’। কিন্তু সিঙ্গাপুর সংলগ্ন এই প্রণালীতে মার্কিন নৌবাহিনীর শক্ত অবস্থান থাকায়, যেকোনো সময় অবরোধের আশঙ্কায় ভোগে বেইজিং। এই ঝুঁকি এড়াতে চীন বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কিয়াকফিউ সমুদ্রবন্দরকে। ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় বঙ্গোপসাগরের এই বন্দর থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত সরাসরি পাইপলাইন ও সড়কপথ তৈরি করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের (ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া) আশঙ্কা, কিয়াকফিউ বন্দর চীনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে গেলে ভারত মহাসাগরে বেইজিংয়ের সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে। তাই যেকোনো মূল্যে এই করিডোর প্রকল্প নস্যাৎ করতে মিয়ানমারের বর্তমান সামরিক জান্তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার নীতি গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন।
সামরিক জান্তাকে কোণঠাসা করতে সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসে বিপুল ভোটে পাস হয়েছে ‘ব্রেভ বার্মা অ্যাক্ট’। জো বাইডেন প্রশাসনের ২০২২ সালের আইনের এই সংশোধিত রূপটি আরও বেশি কঠোর। এই আইনের আওতায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল-গ্যাস কোম্পানি (MOGE) এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি জান্তা বাহিনীর বিমান হামলার সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে মিয়ানমারে এভিয়েশন ফুয়েল বা জেট জ্বালানি সরবরাহেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, জান্তাবিরোধী ‘জাতীয় ঐক্য সরকার’ (NUG) এবং ‘আরাকান আর্মি’র মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে কৌশলগত সহায়তা দেওয়ার পথও উন্মুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের চিত্র সবচেয়ে নাটকীয়ভাবে বদলেছে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যে। সেখানকার ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টিরই (প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা) নিয়ন্ত্রণ এখন আরাকান আর্মির হাতে। জান্তা বাহিনী কেবল সিত্তে ও কিয়াকফিউয়ের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর ধরে রাখতে পেরেছে।
আরাকান আর্মির এই অভাবনীয় উত্থান ভারত ও চীন—উভয় দেশের জন্যই মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনের বিশাল বিনিয়োগ রক্ষার্থে বেইজিং এখন জান্তা সরকার ও আরাকান আর্মি—উভয় পক্ষের সাথেই ‘দ্বৈত কূটনীতি’ বজায় রেখে চলছে। অন্যদিকে, ভারতের ‘কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প’ সরাসরি সিত্তে বন্দরকে ঘিরে আবর্তিত, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরাকান আর্মির আধিপত্যে ভারতের এই কৌশলগত প্রকল্পও এখন চরম হুমকির মুখে।
এই ত্রিমুখী লড়াইয়ের ভৌগোলিক কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ। সিত্তে এবং কিয়াকফিউ বন্দর দুটি বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে খুব কাছেই অবস্থিত। পরাশক্তিগুলো নিজ নিজ স্বার্থে রাখাইনে প্রভাব বিস্তার করতে চাইলেও এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। এরই মধ্যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জেরে ছোঁড়া গুলি ও মর্টার শেল বাংলাদেশে এসে পড়ার ঘটনা ঘটেছে এবং হতাহতের ঘটনাও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা ও ভারত তাদের কৌশলগত কারণে এই সংঘাতে বাংলাদেশের সহযোগিতা বা সমর্থন চাইতে পারে। এর আগে মানবিক করিডোর নিয়েও নানা আলোচনা শোনা গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এখানে যেকোনো এক পক্ষ নেওয়াটা যেমন আত্মঘাতী হতে পারে, তেমনি পুরোপুরি নীরব থাকলেও সংঘাতের আঁচ থেকে বাঁচার কোনো নিশ্চয়তা নেই। মিয়ানমারের এই ছায়াযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে তা অনিশ্চিত হলেও, বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা যে এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।