• বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫২ পূর্বাহ্ন
Headline
যুদ্ধবিধ্বস্ত ৭৭৫টি স্কুল মেরামত করল ইরান পাম্পে তালা, মাঠে ফাটল: তেলের অভাবে ধুঁকছে কৃষি ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের আঁচে নতুন ফ্রন্ট: ইরাকি মিলিশিয়াদের সঙ্গে সৌদি আরবের ‘ছায়াযুদ্ধ’ ইরান ও ইসরায়েলের উত্থান: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দিশেহারা ও নতুন পথের সন্ধানে সৌদি আরব জ্বালানি ফুরিয়ে অচল ১৮ বিদ্যুৎ কেন্দ্র:, লোডশেডিংয়ে হাঁসফাঁস করছে গ্রামবাংলা চালক যখন তেলের লাইনে: গন্তব্যে পৌঁছানোর এক অন্তহীন যুদ্ধ স্বাস্থ্যখাতে নীরব বিপর্যয়: নেপথ্যে কাদের খামখেয়ালি? তেহরানের মৌন অভিমান নাকি গভীরতর কূটনৈতিক ব্যর্থতা? মাদক ও সাইবার অপরাধ রুখতে কড়া হুঁশিয়ারি আইজিপির কলেজছাত্র হত্যায় ৭ জনের ফাঁসি

তেহরানের মৌন অভিমান নাকি গভীরতর কূটনৈতিক ব্যর্থতা?

বিশেষ প্রতিবেদক / ১০ Time View
Update : বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬

নাম তার ‘বাংলার জয়যাত্রা’। কিন্তু সমুদ্রের নীল জলরাশিতে এই জয়যাত্রার পথ এখন যেন এক দুর্ভেদ্য দেয়ালে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার এবং বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’ অতিক্রম করতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) এই জাহাজটিকে। গত শুক্রবার গভীর রাতে সর্বশেষ প্রচেষ্টায়ও যখন সফল হতে পারল না জয়যাত্রা, তখন বিষয়টি কেবল একটি জাহাজের যান্ত্রিক বা রুটিন সমস্যা হিসেবে আর সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এখন একটি বড়সড় কূটনৈতিক ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন বারবার বন্ধুপ্রতিম ইরানের নৌবাহিনী বাংলাদেশি এই জাহাজটিকে বাধা দিচ্ছে? এটি কি নিছকই নিরাপত্তা ইস্যু, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে তেহরানের কোনো গভীর ‘মৌন অভিমান’ বা কূটনৈতিক অসন্তোষ?

শুক্রবার রাতের সেই নাটকীয় প্রত্যাবর্তন

গত শুক্রবার রাত তখন আনুমানিক ৯টা। মিনা সাকার বন্দরের বহির্নোঙর থেকে যাত্রা শুরু করে বাংলার জয়যাত্রা এগোচ্ছিল হরমুজ প্রণালির দিকে। জাহাজের ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম এবং ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিকের চোখে তখন একটাই লক্ষ্য—প্রণালিটি পার হয়ে মুম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা। কিন্তু হরমুজ প্রণালির একেবারে কাছাকাছি পৌঁছানোর পর পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। ইরানের নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জাহাজটিকে থামার সংকেত দেওয়া হয়। ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলামের বর্ণনামতে, ইরানি নৌবাহিনী কোনো নমনীয়তা না দেখিয়ে সরাসরি জাহাজটিকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। শুধু তাই নয়, জাহাজটিকে আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়ার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়। কোনো উপায় না পেয়ে গভীর রাতে বাংলার জয়যাত্রা তার দিক পরিবর্তন করে পুনরায় মিনা সাকার বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। শুক্রবারের এই ব্যর্থতা জয়যাত্রার ইতিহাসে একটি নতুন ক্ষত যোগ করল।

সংঘাতের শুরু ও হরমুজের রুদ্ধদ্বার পরিস্থিতি

ঘটনার সূত্রপাত মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। ওই সময় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়। ইরান তার সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তার অজুহাতে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। মজার বিষয় হলো, এই উত্তেজনার মধ্যেও তেহরান বেশ কিছু ‘বন্ধুপ্রতিম’ দেশের বাণিজ্যিক জাহাজকে হরমুজ পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু সেই তালিকায় বাংলাদেশের এই পতাকাবাহী জাহাজটির নাম বারবার কেন বাদ পড়ছে, তা নিয়েই এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

এর আগে ৪ এপ্রিল বাংলার জয়যাত্রা সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দর থেকে লঙ্গর তুলে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু সেবারও অনুমতির অভাবে জাহাজটিকে ফিরে আসতে হয়। প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে ইরান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বলছে যে তারা বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের জাহাজ কেন ব্রাত্য থাকছে?

কূটনৈতিক শীতলতা: ইরানের ‘কষ্ট’ পাওয়ার নেপথ্যে

বাংলার জয়যাত্রার এই বারংবার ফিরে আসার পেছনে একটি বড় কারণ হতে পারে সম্প্রতি বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যকার তৈরি হওয়া কূটনৈতিক দূরত্ব। ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি গত ১ এপ্রিল একটি সংবাদ সম্মেলনে বেশ আবেগপ্রবণ ও কঠোর মন্তব্য করেছিলেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় বাংলাদেশ সরকার যে ধরনের দায়সারা বিবৃতি দিয়েছে, তাতে তেহরান ‘কষ্ট’ পেয়েছে।

২০২৬ সালের ১ মার্চ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু ইরান আশা করেছিল, একটি ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে ইরানের পাশে দাঁড়াবে অথবা মার্কিন আগ্রাসনের সরাসরি সমালোচনা করবে। কিন্তু বাংলাদেশের ‘ভারসাম্যপূর্ণ’ বা কিছুটা অস্পষ্ট অবস্থান তেহরানকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। রাষ্ট্রদূত জাহানাবাদির সেই ‘কষ্ট পাওয়ার’ প্রভাবই কি এখন মাঝসমুদ্রে বাংলার জয়যাত্রাকে পোহাতে হচ্ছে? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান হয়তো সরাসরি কোনো ঘোষণা না দিয়েও হরমুজ প্রণালিতে বাধা সৃষ্টির মাধ্যমে ঢাকাকে একটি নীরব বার্তা দিচ্ছে।

৩১ নাবিকের উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চিত জীবন

বাংলার জয়যাত্রা জাহাজে রয়েছেন ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক। গত ২৬ জানুয়ারি তারা যখন মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করেন, তখন পরিস্থিতি এমন সংঘাতময় হবে তা হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি। তাদের এই দীর্ঘ সফরের প্রতিটি মুহূর্ত এখন কাটছে চরম উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জাহাজটি কাতারের মেসাইদ বন্দরে পণ্য খালাস করার একদিন পরেই একটি বড় ধরণের দুর্ঘটনার সাক্ষী হতে হয় তাদের। জাহাজ থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে একটি বিশাল তেলের রিজার্ভারে মিসাইল হামলা হয়। আগুনের লেলিহান শিখা আর বিস্ফোরণের শব্দে তখন নাবিকদের মধ্যে প্রাণভয়ের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জয়যাত্রার প্রতিটি নির্ধারিত গন্তব্য বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে। কাতার থেকে সরাসরি মুম্বাই যাওয়ার কথা থাকলেও তা বাতিল হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে মিনা সাকার বন্দরে আটকে থাকার পর নাবিকদের মানসিক অবস্থা এখন তলানিতে। পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশে বসে প্রতিনিয়ত শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। কিন্তু সমুদ্রের বুকে আটকে পড়া এই নাবিকদের ভাগ্যের চাকা যেন আর ঘুরছেই না।

বিএসসি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

বাংলার জয়যাত্রার এই বারবার ব্যর্থতার দায় কার? বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও কেন তারা এই সংকট সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না? শুধু তাই নয়, এখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা নিয়েও বড় ধরণের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদি এটি নিছকই একটি সামরিক বা যান্ত্রিক ভুল বোঝাবুঝি হতো, তবে এতদিনে তা আলোচনার মাধ্যমে মিটে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু টানা কয়েক মাস ধরে একটি জাহাজ এভাবে ফিরে আসা এবং ইরানের রাষ্ট্রদূতের প্রকাশ্য অসন্তোষ ইঙ্গিত দেয় যে, সমস্যাটি অত্যন্ত গভীরে এবং রাজনৈতিক।

ঢাকায় ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন সংস্কার নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও, মধ্যপ্রাচ্যের মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলে বাংলাদেশি স্বার্থ রক্ষায় তাদের যে জোরালো ভূমিকা দরকার ছিল, তা এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়নি। তেহরানের সঙ্গে পর্দার আড়ালে কোনো আলোচনা চলছে কি না, তাও পরিষ্কার নয়। কূটনৈতিক ব্যর্থতার খেসারত দিতে গিয়ে এখন জাহাজের চার্টার ফি বাবদ প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে।

অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষতি

বাংলার জয়যাত্রা কেবল একটি জাহাজ নয়, এটি বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্র অর্থনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বৈশ্বিক বাণিজ্যের এই সংকটের সময়ে নিজস্ব পতাকাবাহী জাহাজের সক্ষমতা হারানো একটি দেশের ভাবমূর্তির জন্য চরম নেতিবাচক। এর ফলে বিদেশি বিমাকারী সংস্থাগুলো বাংলাদেশি জাহাজের ওপর প্রিমিয়াম বাড়িয়ে দিতে পারে, যা ভবিষ্যতে আমাদের সমুদ্র বাণিজ্যের খরচ আরও বাড়িয়ে দেবে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ পথে যদি আমাদের জাহাজ ব্রাত্য হয়ে পড়ে, তবে তা আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও দীর্ঘমেয়াদী হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

অন্ধকারের শেষে আলোর প্রত্যাশা

ইরান ও বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের ভ্রাতৃত্বের। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘ভাই’ পরিচয়ের চেয়ে ‘স্বার্থ’ এবং ‘অবস্থান’ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার জয়যাত্রার এই ফিরে আসা প্রমাণ করে যে, কেবল ‘বন্ধু দেশ’ বলে দাবি করলেই আন্তর্জাতিক সংকটে পার পাওয়া যায় না। এর জন্য প্রয়োজন বিচক্ষণ কূটনীতি এবং সঠিক সময়ে সঠিক অবস্থান নেওয়া।

তেহরান যদি সত্যিই বাংলাদেশের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে থাকে, তবে সেই বরফ গলানোর দায়িত্ব ঢাকার নীতিনির্ধারকদেরই নিতে হবে। ৩১ জন নাবিকের জীবন এবং দেশের একটি মূল্যবান রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এখন প্রয়োজন উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ। অন্যথায় ‘বাংলার জয়যাত্রা’ নামটির সার্থকতা কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে, বাস্তব সমুদ্রপথে তা পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে মিনা সাকার বন্দরেই পড়ে থাকবে। বিশ্ববাসী দেখবে একটি ছোট দেশের বড় স্বপ্নের জাহাজ কীভাবে ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচে মাঝসমুদ্রে মুখ থুবড়ে পড়েছে। আমরা আশা করি, অন্ধকার এই মেঘ দ্রুতই কেটে যাবে এবং জয়যাত্রা পুনরায় তার প্রকৃত গন্তব্যে নীল জলরাশি চিরে এগিয়ে যাবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category