ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলায় চাঞ্চল্যকর কলেজছাত্র শাহীনুর আলম ওরফে ইকবাল (১৯) হত্যাকাণ্ডের প্রথম ধাপের আইনি বিচার সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) বিকেলে আসামিদের উপস্থিতিতে এই মামলার রায় ঘোষণা করেন ময়মনসিংহের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ জাকির হোসেন। রায়ে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার দায়ে সাতজনকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের এমন কঠোর রায় স্থানীয় জনমনে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা নতুন করে জোরালো করেছে।
লোমহর্ষক এই ঘটনার সূত্রপাত ২০২১ সালের ৩১ মে। ওইদিন রাত ১১টার পর তারাকান্দার পলাশকান্দা গ্রাম থেকে হঠাৎ নিখোঁজ হন কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী ইকবাল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর কোনো সন্ধান না পেয়ে তার বড় ভাই ইঞ্জিনিয়ার মো. সেলিম মিয়া বাদী হয়ে তারাকান্দা থানায় অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশি তদন্তের একপর্যায়ে নিখোঁজের পাঁচ দিন পর, ৫ জুন তরুণ ইকবালের বাড়ির পাশের একটি সেপটিক ট্যাংক থেকে তার গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে সেপটিক ট্যাংকে লাশ গুম করার এই প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনায় দেখা গেছে, যা অপরাধীদের চরম নিষ্ঠুরতা ও পূর্বপরিকল্পনারই প্রমাণ দেয়।
মামলার তদন্ত চলাকালে পুলিশের বিচক্ষণতায় ঘটনার মূল রহস্য দ্রুত উন্মোচিত হতে থাকে। গ্রেপ্তারকৃত আসামি আব্দুল হেলিম এবং খালেদা আক্তার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলে হত্যার পেছনের কারণ ও বাকি জড়িতদের নাম বেরিয়ে আসে। বাদীপক্ষের আইনজীবী রফিকুল ইসলামের দেওয়া তথ্যমতে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামি হলেন—উপজেলার পলাশকান্দা গ্রামের আসিফ রানা, মোহাম্মদ আলী, গোলাম হোসেন, আব্দুল হেলিম, ফরিদ আহম্মেদ, ইউনুছ আলী এবং শামছুল হক। এছাড়াও হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার দায়ে খালেদা আক্তার ও রেহেনা খাতুন নামের দুই নারীকে সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে; জরিমানার অর্থ অনাদায়ে তাদের আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
বাংলাদেশের বিচারিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলাগুলোর রায় পেতে অনেক সময় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। তবে এই মামলার রায়ে ইকবালের পরিবার অন্তত কাঙ্ক্ষিত বিচারের দেখা পেয়েছে। রায়ে চূড়ান্ত সন্তোষ প্রকাশ করে মামলার বাদী ও নিহতের বড় ভাই সেলিম মিয়া জানিয়েছেন, পুলিশ এবং আইনজীবীদের নিঃস্বার্থ ও আন্তরিক সহযোগিতার কারণেই আজ তারা এই ন্যায়বিচার পেয়েছেন। উচ্চ আদালতেও আইনি প্রক্রিয়া শেষে যেন এই রায় বহাল থাকে এবং দ্রুত আসামিদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়, এখন সেটাই নিহত তরুণের পরিবারের একমাত্র চাওয়া।