২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটে। এই অভ্যুত্থান চলাকালে দেশজুড়ে নজিরবিহীন সহিংসতা, হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার এবং তাদের সহযোগী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এরপর দেশব্যাপী শত শত মামলা দায়ের করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন ও পুলিশের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থান কেন্দ্রিক দায়ের হওয়া মামলাগুলোর ৯০ শতাংশেরও বেশি এখনও তদন্তাধীন রয়ে গেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, বেশিরভাগ মামলার তদন্তে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন এবং প্রকৃত অপরাধীদের যেন নিখুঁত প্রমাণের ভিত্তিতে আইনের আওতায় আনা যায়—সেজন্যই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে সারা দেশে প্রায় ১,৭৩০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা ৭০৭টিরও বেশি। সারা দেশে দায়ের হওয়া এই মামলাগুলোর মধ্যে ৭৩১টিই হলো হত্যা মামলা, যেখানে হাজারো ছাত্র-জনতার রক্ত ঝরেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, দায়েরকৃত মোট মামলার মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ১০৬টি মামলার অভিযোগপত্র বা চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, দায়ের হওয়া মোট মামলার ৯০ শতাংশেরও বেশি এখনও প্রাথমিক বা মধ্যবর্তী তদন্তের পর্যায়ে আটকে আছে। অন্যদিকে, উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণের অভাবে ৪৩৭টি মামলার ক্ষেত্রে প্রায় ২,৮৩০ জন ব্যক্তিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে আদালতে অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ।
মামলার অভিযোগগুলোর ভয়াবহতা উঠে এসেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (OHCHR)-এর প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনেও। ওই প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তৎকালীন সরকার তাদের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের সশস্ত্র অঙ্গসংগঠনগুলোর (ছাত্রলীগ ও যুবলীগ) সঙ্গে সমন্বিতভাবে শান্তিপূর্ণ ছাত্র বিক্ষোভ দমনে মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছিল। পুলিশ, র্যাব এবং বিজিবির সদস্যরা আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে, যার ফলে নজিরবিহীন প্রাণহানি ঘটে। আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি মামলাগুলোর গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
মামলার তদন্তে এই বিলম্ব বা ধীরগতির পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ তুলে ধরেছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তারা:
ঢালাও মামলার সংস্কৃতি: বিগত সরকারের পতনের পর সারা দেশে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা ব্যক্তিগত ক্ষোভের জেরে ঢালাওভাবে মামলা দায়ের করার প্রবণতা দেখা যায়। একটি হত্যা মামলায় শত শত অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। এজাহারে নাম থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক তদন্তে অনেকের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে না। যাচাই-বাছাই করতে গিয়েই তদন্তে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় হচ্ছে।
প্রমাণ ও আলামত নষ্ট: বিগত সরকারের প্রতি অনুগত অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী এখনও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে রয়ে গেছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি নিজেদের এবং দলীয় নেতাদের বাঁচাতে মামলার অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, সিসিটিভি ফুটেজ ও আলামত ইতোমধ্যে নষ্ট করে ফেলেছে, যা তদন্ত প্রক্রিয়াকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করছে।
সতর্ক ও নিরপেক্ষ তদন্তের তাগিদ: পিবিআই এবং সিআইডিসহ অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থাগুলো তাড়াহুড়ো করে কোনো ভুল প্রতিবেদন দিতে নারাজ। পুলিশ সদর দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিরপরাধ কোনো ব্যক্তিকে যেন বিচারের মুখোমুখি হতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি অভিযোগ চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
সাধারণ ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি জুলাই গণহত্যার বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও (আইসিটি)। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের তথ্যমতে, ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত জুলাই-আগস্টের মানবতাবিরোধী অপরাধ, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং গুমের ঘটনায় ৪৫০টিরও বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে।
এর মধ্যে বেশ কয়েকটি হাই-প্রোফাইল মামলার তদন্ত প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষ করে আশুলিয়ায় লাশ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা, চানখাঁরপুল ও যাত্রাবাড়ী গণহত্যা এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মূল মামলাগুলোর প্রতিবেদন খুব শিগগিরই ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে অন্তত ২৪ জন চৌকস কর্মকর্তা এই তদন্ত কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের এসব মামলায় ইতিমধ্যে সাবেক সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা ও সাবেক মন্ত্রী-এমপিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, আমির হোসেন আমু এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।
রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি যেসব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হয়েছে। সাবেক দুই আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন ও এ কে এম শহীদুল হকসহ অন্তত ২১ জন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। দেশব্যাপী সর্বমোট ৫ হাজারেরও বেশি নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকে এই মামলাগুলোতে গ্রেফতার করা হয়েছে।
মামলার তদন্তে এই ধীরগতির কারণে জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। যারা নিজেদের সন্তান, ভাই বা স্বজন হারিয়েছেন, তারা চাইছেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই বিচার প্রক্রিয়া শেষ হোক। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, যারা সরাসরি রাস্তায় নেমে নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে এবং যারা নেপথ্যে থেকে এই গণহত্যার নির্দেশ দিয়েছে—তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে অপরাধীরা যেন কোনোভাবেই পার পেয়ে না যায়, সে বিষয়ে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে।
ছাত্র-জনতার এই আত্মত্যাগের মূল উদ্দেশ্যই ছিল একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্য পূরণে জুলাই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। তদন্তকারী সংস্থাগুলো যতই সতর্কতার কথা বলুক না কেন, তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব মামলার চার্জশিট প্রদান এবং বিচারিক কার্যক্রম শুরু করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।