• সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ০৬:৪৭ অপরাহ্ন
Headline
বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তির বর্তমান-ভবিষ্যত-রিন্টু আনোয়ার গাইবান্ধায় ‘বসন্ত’ রোগে স্কুলশিক্ষকের মৃত্যু, আক্রান্ত পুরো পরিবার হাম ও উপসর্গ নিয়ে একদিনে সর্বোচ্চ ১৭ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ৪১ হাজার পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান: বাংলাদেশের জন্য সুযোগ নাকি বিপদ? হাওরের বুক চিরে কৃষকের বোবাকান্না: অসময়ের ঢলে তলিয়ে গেল হাজার কোটি টাকার সোনালি স্বপ্ন ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদে দেশের অর্থনীতি: ভুল নীতি ও অস্বচ্ছ চুক্তির দায় কার? বিশ্বকাপের ক্ষণগণনা শুরু: কবে চূড়ান্ত দল ঘোষণা করবে ৪৮ দেশ? ড. ইউনূস সরকারের সব কর্মকাণ্ডের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট ফের বিয়ের পিঁড়িতে ইমরান খানের সাবেক স্ত্রী জেমিমা

নেতাদের ঘন ঘন চীন সফর: নিছক রাজনৈতিক কৌশল নাকি ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ?

Reporter Name / ৪ Time View
Update : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। ক্ষমতার এই পালাবদলের পর প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দৃশ্যমান অবনতি ও এক ধরনের শীতলতা তৈরি হয়। ভূ-রাজনীতির এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট শূন্যস্থান পূরণে বাংলাদেশকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি কাছে টেনে নিয়েছে এশিয়ার আরেক পরাশক্তি চীন।

দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য এবং পারস্পরিক আদান-প্রদান ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের চীনে ধারাবাহিক যাতায়াত। নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের পর থেকেই চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে দেশের শীর্ষ রাজনীতিকরা ঘন ঘন সে দেশে সফর করছেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি নির্দিষ্ট কোনো দেশের বলয়ে আবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক দলের নেতাদের এই ধারাবাহিক সফরগুলো কেবল সাধারণ আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে সুগভীর রাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত ইঙ্গিত।


পটপরিবর্তন ও চীনের বহুমুখী কৌশল

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই চীন অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়নের নতুন প্রচেষ্টা শুরু করে। এই সম্পর্ক উন্নয়নের প্রথম ও প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পর্যায়ে পারস্পরিক বিনিময় বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় বেইজিং।

এরই অংশ হিসেবে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন মাসের মাথায় প্রথম বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানায় চীনের কমিউনিস্ট পার্টি। সে সময় বিএনপির চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল চীন সফর করে, যার মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত বাংলাদেশে চীনা নেতৃত্বের সঙ্গে নতুন করে রাজনৈতিক যোগাযোগের সূচনা হয়।

ইসলামি দলগুলোর সফর ও চীনের বার্তা

বিএনপির পর ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের একটি প্রতিনিধিদল চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে বেইজিং সফর করে, যা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দেয়। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের ওই দলে খেলাফত মজলিস, হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির শীর্ষ নেতারাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এই সফরে তাদের চীনের মুসলিম অধ্যুষিত জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়া হয়, যা ছিল চীনের পক্ষ থেকে একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা।

এই সফর শুরুর আগে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন ইসলামি দলগুলোর নেতাদের সম্মানে এক বিশেষ বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করেন। সেখানে তিনি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে বলেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে এক ‘ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে’ দাঁড়িয়ে আছে।” তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেন যে, চীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সমাজের সব স্তরের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা আরও গভীর করতে চায়। তার এই বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে পরিবর্তনই আসুক না কেন, চীন নিজেকে সব পক্ষের কাছে একজন ‘বিশ্বস্ত বন্ধু’ ও ‘উন্নয়ন সহযোগী’ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া।

বহুমাত্রিক প্রতিনিধিদল ও ধারাবাহিক যোগাযোগ

চীনের এই সম্পর্ক উন্নয়নের কৌশল কেবল নির্দিষ্ট কোনো দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক শ্রেণির প্রতিনিধিদের নিয়ে ২২ সদস্যের একটি বৃহৎ ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী’ প্রতিনিধিদল চীন সফর করে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের নেতৃত্বে এই দলে নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদসহ মোট আটটি দলের নেতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও সাংবাদিকরা ছিলেন। ১৩ দিনব্যাপী ওই সফরে তারা চীনের বিভিন্ন প্রদেশ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামো প্রকল্প পরিদর্শন করেন।

এরপর একই বছরের ২২ জুন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের একটি দল এবং আগস্ট মাসে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আট নেতার চার দিনের চীন সফর দুই দেশের রাজনৈতিক বোঝাপড়াকে আরও মজবুত করে।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্পর্ক জোরদার

রাজনৈতিক দলের বাইরে রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও চীনের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করা হয়। গত বছরের জানুয়ারিতে তৎকালীন সরকারের সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন তার প্রথম বিদেশ সফরে বেইজিং যান। সেখানে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সঙ্গে তার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে চীনের দেওয়া ঋণের সুদের হার কমানো এবং পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধ জানালে চীন তাতে ইতিবাচক সাড়া দেয়। তৌহিদ হোসেনের ওই সফল সফরের পর সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও চীন সফর করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও একধাপ এগিয়ে নেন।

নতুন সরকার ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। নতুন এই সরকার গঠনের পরও বিএনপি নেতাদের প্রথম বিদেশ সফরটি হয় চীনে।

গত ১৬ এপ্রিল চীন সরকারের বিশেষ আমন্ত্রণে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে ১৯ সদস্যের একটি অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল চীন সফরে যায়। বেইজিংয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্টভাবে ‘এক চীন’ নীতির প্রতি তার দলের এবং দেশের দৃঢ় সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান চেং-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত সরকার আগামীতে চীন ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবে এবং দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য বজায় রাখবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আসন্ন সফর ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা

এই ধারাবাহিকতায় আগামী ৫ মে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সফরে চীন যাচ্ছেন বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। সেখানে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই সফরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রাধান্য পাবে:

  • দুই দেশের সম্পর্কের সামগ্রিক পর্যালোচনা।

  • নতুন অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও মেগা উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা।

  • আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে মতবিনিময়।

  • জাতিসংঘে সভাপতি নির্বাচনে চীনের আনুষ্ঠানিক সমর্থন কামনা।

  • দেশের চলমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় চীনের কাছে বিশেষ সহযোগিতা বা ঋণ সহায়তা চাওয়া।

বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন: নিছক রাজনীতি নাকি গভীর অর্থনীতি?

কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই মসৃণ। তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশে ভারতের একচ্ছত্র প্রভাব থাকার কারণে চীন অনেক কৌশলগত ও অর্থনৈতিক কাজের সুযোগ হারিয়েছিল। ৫ আগস্টের পর ভারত সেই প্রভাব হারালে চীন অত্যন্ত সুকৌশলে সেই শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে আসে।

চীনের এই দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রসঙ্গে সাবেক একজন শীর্ষ কূটনীতিক জানান, “চীনের সঙ্গে গত এক-দেড় বছরে ধারাবাহিকভাবে যে পরিমাণ সফর বিনিময় হয়েছে, এমনটা অতীতে কখনোই দেখা যায়নি। বিশেষ করে আগস্টের পর দুই দেশ একে অপরের অনেক কাছাকাছি এসেছে। তবে চীনের এই আগ্রহের পেছনে শুধু রাজনীতি নেই, রয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ।”

তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, “বাংলাদেশে চীনের প্রায় ৪০ বিলিয়ন (৪ হাজার কোটি) ডলারের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। এই মেগা বিনিয়োগ এবং প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতেই চীন বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন থেকে শুরু করে সব প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। রাজনৈতিক দলগুলোর এই সফরগুলোকে তাই রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক—উভয় দিক থেকেই দেখা উচিত। বাংলাদেশ যদি এই ভূ-রাজনৈতিক খেলায় নিজের জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে ভারত ও চীনের সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, তবে এই ঘনিষ্ঠতায় দেশের জন্য ব্যাপক ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category