ইসরায়েলের টানা দুই বছরের সামরিক অভিযানে গাজা উপত্যকা এখন কার্যত এক বিরান ধ্বংসস্তূপ। এই ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অন্তত আট হাজার ফিলিস্তিনির মরদেহ চাপা পড়ে আছে বলে জানা গেছে। ভবনগুলোর নিচে হাজারো মরদেহ আটকে থাকায় স্বজনহারা অনেকেই এখনো তাদের প্রিয়জনদের শেষ বিদায় বা দাফনটুকুও সম্পন্ন করতে পারেননি।
ধ্বংসস্তূপ সরাতে লাগবে ৭ বছর
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক কর্মকর্তার বরাতে ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজ জানিয়েছে, গাজার মোট ধ্বংসাবশেষের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১ শতাংশেরও কম সরানো সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে যে ধীরগতিতে কাজ চলছে, তাতে পুরো গাজার ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে অন্তত সাত বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। গাজার সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভারী যন্ত্রপাতি ও পর্যাপ্ত জনবলের তীব্র সংকটের কারণেই উদ্ধার ও পরিষ্কার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির পরও থামেনি রক্তপাত
গত অক্টোবরে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির কথা বলা হলেও গাজায় ইসরায়েলের অভিযান কখনোই পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী:
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে নতুন করে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৮২৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২,৩৪২ জন আহত হয়েছেন।
দুই বছর ধরে চলা এই ভয়াবহ যুদ্ধে মোট নিহতের সংখ্যা ৭২ হাজার ছাড়িয়েছে।
আহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার মানুষ।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, ইসরায়েলের টানা হামলায় গাজার ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। উপত্যকাটির পুনর্গঠনে প্রায় ৭০ বিলিয়ন (৭ হাজার কোটি) ডলার ব্যয় হতে পারে বলে হিসাব দিয়েছে সংস্থাটি।
গাজা অভিমুখে যাওয়া মানবিক ত্রাণবহর ‘সুমুদ ফ্লোটিলা’ থেকে আটক হওয়া দুজন বিদেশি অ্যাক্টিভিস্টকে জিজ্ঞাসাবাদের পর রোববার ইসরায়েলের আশকেলন আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে। স্পেনের সাইফ আবু কেশেক ও ব্রাজিলের থিয়াগো আভিলা নামের এই দুই অ্যাক্টিভিস্টকে আটকের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
তাদের আইনি সহায়তা দেওয়া সংগঠন ‘আদালাহ’ জানিয়েছে, ইসরায়েল এই দুই কর্মীর আটকাদেশ আরও চার দিন বাড়ানোর আবেদন করেছে। ভূমধ্যসাগরে গাজা অভিমুখী ৫০টির বেশি নৌযানের এই বহরটি ফ্রান্স, স্পেন ও ইতালি থেকে যাত্রা করেছিল। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক জলসীমায় গ্রিস উপকূলের কাছে ইসরায়েলি বাহিনী বহরটির গতিরোধ করে। আটক দুই কর্মীর অভিযোগ, জিজ্ঞাসাবাদের আগে তাদের চোখ বেঁধে রাখা হয় এবং তারা মারধর ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তবে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, আটককৃতরা হামাস-সংশ্লিষ্ট একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত।
গাজার পাশাপাশি পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি সহিংসতা ক্রমশ বাড়ছে। সেখানে স্কুল ও শিক্ষার্থীদের ওপর প্রায়ই হামলা চালাচ্ছে সশস্ত্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও সেনারা।
গত ২১ এপ্রিল রামাল্লাহর কাছে মুগাইয়ির গ্রামে এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। সশস্ত্র ইসরায়েলি রিজার্ভ সেনারা পাহাড়ের ওপর থেকে একটি স্কুল লক্ষ্য করে গুলি চালালে ১৪ বছর বয়সী ছাত্র আওস আল-নাসান প্রাণ হারায়। একই ঘটনায় নিহত হন আরও একজন ফিলিস্তিনি।
বিপন্ন শিক্ষাব্যবস্থা ও শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য
জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গাজায় শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নজিরবিহীন আঘাত হানা হয়েছে:
এখন পর্যন্ত অন্তত ১৮ হাজার ৬৩৯ জন শিক্ষার্থী এবং ৭৯২ জন শিক্ষক নিহত হয়েছেন।
ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপত্যকাটির প্রায় ৯০ শতাংশ স্কুল ভবন।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) সতর্ক করে বলেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এমন ধারাবাহিক হামলা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি গাজার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনকে এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।