• রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ০৯:১৩ পূর্বাহ্ন

যেভাবে পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়াল ইরান

Reporter Name / ৬৬ Time View
Update : রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

আট বছর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন তেহরানের সঙ্গে করা ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি থেকে সম্পূর্ণ একতরফা ও অযৌক্তিকভাবে বেরিয়ে আসেন, তখন থেকেই মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ একটি বিপজ্জনক দিকে মোড় নিতে শুরু করে। চুক্তির প্রতিটি শর্ত অক্ষরে অক্ষরে মেনে ইরান নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক পর্যায়ে নামিয়ে এনেছিল। কিন্তু ওয়াশিংটনের চরম হঠকারিতা, ধারাবাহিক বিশ্বাসভঙ্গ এবং অযাচিত সামরিক আগ্রাসনের কারণে নিজেদের অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাধ্য হয়েই পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানোর পথে হাঁটতে হয়েছে তেহরানকে। ফলশ্রুতিতে, দীর্ঘ এই বঞ্চনা ও আত্মরক্ষার তাগিদে আজ ইরানের হাতে মজুত হয়েছে প্রায় ২২ হাজার পাউন্ড বা ১১ টন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। ইরান যেন কখনোই নিজেদের প্রতিরক্ষায় পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে, সেই হীন উদ্দেশ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশটিতে নতুন করে আগ্রাসন ও যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ওয়াশিংটনের এই বলপ্রয়োগের নীতি বুমেরাং হয়ে ফিরেছে। এই বিশাল ইউরেনিয়ামের মজুতের ভবিষ্যৎ কী এবং এটি কোথায় সুরক্ষিত আছে, তা নিয়ে খোদ মার্কিন প্রশাসন ও পশ্চিমাদের মাঝে এখন চরম ধোঁয়াশা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

ইউরেনিয়াম এমন একটি জাদুকরী ও শক্তিশালী রাসায়নিক উপাদান, যা দিয়ে একটি পুরো শহরকে যেমন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত করা যায়, তেমনি আগ্রাসী শত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষায় চূড়ান্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থাও গড়ে তোলা যায়। ইউরেনিয়ামের নিম্ন মাত্রা সাধারণত পারমাণবিক চুল্লিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো গঠনমূলক ও শান্তিপূর্ণ কাজে লাগে। আর ‘সমৃদ্ধকরণ’ বা এনরিচমেন্ট নামক এক বিশেষ ও জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর মাত্রা বাড়িয়ে পারমাণবিক অস্ত্রও তৈরি করা সম্ভব। বিজ্ঞানের ভাষায়, ইউরেনিয়ামের মাত্রা যত বাড়তে থাকে, এটিকে সমৃদ্ধ করার কাজ তত সহজ ও দ্রুত হতে থাকে। শূন্য থেকে ২০ শতাংশে পৌঁছানো কারিগরি দিক থেকে যতটা কঠিন, ২০ থেকে ৬০ শতাংশ বা পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশে পৌঁছানো তার চেয়ে অনেক বেশি সহজ ও স্বল্প সময়ের ব্যাপার। আর বিজ্ঞানের এই অমোঘ সত্যটিই এখন ওয়াশিংটনের রাতের ঘুম হারামের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০৬ সালে ইরান যখন বড় আকারে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা শুরু করে, তখন তারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল যে, এই কাজ শুধুই শান্তিপূর্ণ, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব সবসময়ই ইরানের এই আইনি অধিকারকে অযৌক্তিক সন্দেহের চোখে দেখেছে। ২০১০ সালে ইরান ঘোষণা দেয়, তারা একটি মেডিকেল ও গবেষণা চুল্লির জ্বালানি তৈরির জন্য ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে। আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী, বেসামরিক কাজে ইউরেনিয়াম ব্যবহারের এটিই সর্বোচ্চ মাত্রা। এরপরও পশ্চিমাদের অযাচিত অর্থনৈতিক চাপ ও ভিত্তিহীন অবরোধ থেকে মুক্তি পেতে তৎকালীন ওবামা প্রশাসনের আমলে দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ছয় পরাশক্তির সঙ্গে ইরানের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি বা জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন (JCPOA) স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, আগামী ১৫ বছরের জন্য ইরান তাদের ইউরেনিয়ামের মাত্রা ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশের বেশি বাড়াবে না এবং মজুতের পরিমাণও অত্যন্ত সীমিত রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতিটি প্রতিবেদন সাক্ষী দেয় যে, ইরান অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে সেই চুক্তি মেনে চলেছিল। স্রেফ শান্তির সদিচ্ছায় তেহরান চুক্তির আওতায় তাদের ২৫ হাজার পাউন্ড বা ১২ দশমিক ৫ টন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয় এবং নিজেদের মজুত মাত্র ৬৬০ পাউন্ডের নিচে নামিয়ে আনে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই সম্পূর্ণ একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন। শুধু তাই নয়, উল্টো ইরানের ওপর চাপিয়ে দেন চরম অমানবিক, বেআইনি ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। এটি ছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা। ইতিহাস সাক্ষী, ট্রাম্প যখন এই চুক্তি বাতিল করেন, তখন ইরানের কাছে একটি বোমা বানানোর মতো সামান্যতম ইউরেনিয়ামও ছিল না। চুক্তির নির্লজ্জ বরখেলাপ করল যুক্তরাষ্ট্র, আর তার সম্পূর্ণ অন্যায় খেসারত দিতে হলো শান্তিকামী ইরানকে। এই চরম বিশ্বাসঘাতকতা এবং অর্থনৈতিক শ্বাসরোধকারী নীতির মুখে বাধ্য হয়েই ইরান তাদের জাতীয় সুরক্ষার স্বার্থে অধিক মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা শুরু করে। শুরুতে তারা পশ্চিমা দেশগুলোকে পুনরায় চুক্তিতে ফেরাতে এবং একটি ন্যায়সঙ্গত দরকষাকষির কৌশল হিসেবে ধীরগতিতে ও নিম্ন মাত্রায় সমৃদ্ধকরণ করে। কিন্তু পশ্চিমাদের দিক থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় এবং উল্টো হুমকির মাত্রা বেড়ে যাওয়ায়, ২০২১ সালের শুরুতে—ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে—তারা এই মাত্রা ২০ শতাংশে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে জো বাইডেন প্রশাসন ক্ষমতায় এসে বাতিল হয়ে যাওয়া চুক্তির কিছু অংশ পুনরায় চালুর মৌখিক আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তারা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। এই অন্তহীন টালবাহানার ফলে বাধ্য হয়েই ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা নজিরবিহীনভাবে বাড়াতে থাকে এবং এক পর্যায়ে তা ৬০ শতাংশে উন্নীত করে, যা পারমাণবিক বোমার জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার খুব কাছাকাছি।

পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয় যখন ২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসেন। মার্কিন আগ্রাসন, সামরিক উসকানি ও ক্রমাগত হুমকির মুখে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের হার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। নিজেদের আত্মরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে ইরান অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত বাড়াতে বাধ্য হয়। এরপর ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের এক ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ এবং সর্বশেষ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন আগ্রাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করে ইরানের নাতাঞ্জ ও ফোরদোর সমৃদ্ধকরণ কারখানাগুলোতে এবং ইসফাহানের ইউরেনিয়াম সংরক্ষণের সুড়ঙ্গগুলোতে বোমাবর্ষণ করে। একটি স্বাধীন দেশের বেসামরিক ও বৈজ্ঞানিক স্থাপনায় এহেন নগ্ন হামলার পর নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ইরান আইএইএ-র সঙ্গে সব ধরনের সহযোগিতা স্থগিত করতে বাধ্য হয়। কারণ, আইএইএ-র পরিদর্শনের আড়ালে পশ্চিমা গোয়েন্দারা এই স্থাপনাগুলোর তথ্য পাচার করছিল বলে তেহরানের যৌক্তিক সন্দেহ ছিল। এর ফলে দেশটির সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোর ওপর পশ্চিমাদের নজরদারিও সম্পূর্ণ ও বৈধভাবেই বন্ধ হয়ে যায়।

বর্তমানে এই ১১ টন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ঠিক কোথায় আছে, তা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দাদের চরম বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়েছে। অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট নজরদারি থাকা সত্ত্বেও সরাসরি পরিদর্শনের কোনো সুযোগ না থাকায় পেন্টাগন নিশ্চিত করে কিছুই বলতে পারছে না। ধারণা করা হচ্ছে, তেজস্ক্রিয় ও রাসায়নিকভাবে বিপজ্জনক এই বিপুল মজুতের কিছু অংশ হয়তো মার্কিন বোমার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে, অথবা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত কোনো অজানা গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এখন নিজেদের সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা ঢাকতে গণমাধ্যমে দাবি করছে যে, মার্কিন স্যাটেলাইটগুলো মাটির গভীরে চাপা পড়া ওই ইউরেনিয়ামের ওপর কড়া নজর রাখছে এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নষ্ট হওয়ায় এই মজুত নাকি ইরানের আর কোনো কাজেই আসবে না।

তবে নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মার্কিন প্রশাসনের এই দাবিকে স্রেফ ‘আত্মতুষ্টি’ ও ‘মুখ রক্ষার চেষ্টা’ হিসেবেই দেখছেন। তাদের মতে, ইরান পশ্চিমাদের আগ্রাসী চরিত্র ও চুক্তিভঙ্গের ইতিহাস সম্পর্কে আগে থেকেই খুব ভালোভাবে অবগত ছিল। তাই আগেভাগেই হয়তো তারা ইসফাহান স্থাপনার পাশের দুর্গম ও অভেদ্য পাহাড়ি সুড়ঙ্গগুলোতে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও অত্যন্ত সুরক্ষিত সমৃদ্ধকরণ কারখানা তৈরি করে রেখেছে, যা মার্কিন বোমার নাগালের সম্পূর্ণ বাইরে। তেহরান অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে তাদের ইউরেনিয়ামের মূল মজুত এই এলাকাতেই সংরক্ষণ করেছে বলে অনেক বিশ্লেষকের জোরালো ধারণা। যদি এই ধারণা সত্যি হয়, তবে এটি স্পষ্ট যে ইরানের কাছে এমন শক্তিশালী ও গোপন স্থাপনা রয়েছে, যেখানে তারা নিজেদের সুরক্ষার স্বার্থে যেকোনো মুহূর্তে চূড়ান্ত পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা এটি বারবার প্রমাণসহ তুলে ধরেছেন যে, যুদ্ধ শুরুর সময় ইরানের দিক থেকে তাৎক্ষণিক কোনো পারমাণবিক হুমকি ছিল না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই অবিরাম ও অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার নীতিই আজ ইরানকে এই চরম প্রতিরোধের পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছে।

পরিশেষে এটি নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, পারমাণবিক চুক্তির নামে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক প্রতারণা, অমানবিক অর্থনৈতিক অবরোধ এবং একের পর এক সামরিক আগ্রাসনই আজ মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতা এবং ইউরেনিয়াম সংকটের মূল কারণ। ইরান কখনোই স্বপ্রণোদিত হয়ে পারমাণবিক সংঘাতের দিকে পা বাড়াতে চায়নি, বরং তারা সবসময় আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধান চেয়েছে, যার প্রমাণ তারা ২০১৫ সালের চুক্তিতেই দিয়েছিল। কিন্তু যখন খোদ পরাশক্তিগুলো নির্লজ্জভাবে চুক্তি ভেঙে একটি স্বাধীন দেশের ওপর আক্রমণ চালায়, তখন সেই দেশের সামনে আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধ গড়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা থাকে না। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিণামদর্শী ও হঠকারী নীতির কারণেই আজ ইরান নিজেদের রক্ষাকবচ হিসেবে ১১ টন ইউরেনিয়ামের এক বিশাল মজুত গড়ে তুলতে বাধ্য হয়েছে, যা এখন খোদ ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের জন্যই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতির সম্পূর্ণ দায়ভার কেবল যুক্তরাষ্ট্রকেই নিতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category