• মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ০৬:৫২ অপরাহ্ন
Headline
স্থানীয় নির্বাচন এ বছরেই দেওয়ার দাবি, ১০ মে প্রার্থী ঘোষণা করবে এনসিপি মে মাসে অপরিবর্তিত ১২ কেজি এলপিজির দাম, বাড়ল অটোগ্যাস এক বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দুর্নীতি রোধে কড়া বার্তা মির্জা ফখরুলের হামের টিকা কেন দেওয়া হয়নি তা খতিয়ে দেখা হবে: প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা পশ্চিমবঙ্গে যে সরকারই আসুক, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বদলাবে না: শামা ওবায়েদ পুশইন হলে কড়া ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ: পররাষ্ট্রমন্ত্রী লোডশেডিং নয়, কেবল কারিগরি ত্রুটিতেই যাচ্ছে বিদ্যুৎ: মন্ত্রীর রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক মায়ের জয়: ‘এটি আমার ব্যক্তিগত জয়’, আবেগী মিমি চক্রবর্তী জেল পালানো জঙ্গিদের খোঁজে দেশজুড়ে রেড অ্যালার্ট ডুবছে উত্তর-পূর্বাঞ্চল: আট নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে, স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে ‘রোদেলা’ পূর্বাভাস

কলকাতার তখত ও ঢাকার উদ্বেগ: পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে কেন নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের ভাগ্য?

Reporter Name / ৭ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গ—ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য হলেও বাংলাদেশের জন্য এটি কেবল মানচিত্রের ওপারে থাকা কোনো ভূখণ্ড নয়। দুই বাংলার নাড়ির টান, অভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি এবং দীর্ঘ চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি সীমান্ত এই রাজ্যটিকে ঢাকার জন্য এক অপরিহার্য প্রতিবেশীতে পরিণত করেছে। তাই কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংস বা নবান্নের দখল কার হাতে যাবে, তা নিয়ে ঢাকার রাজনৈতিক অলিন্দে আলোচনা চলাটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে এবারের ২৯৪ আসনের বিধানসভা নির্বাচন এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন বাংলাদেশেও ক্ষমতার পট পরিবর্তন হয়েছে। ৬ কোটি মানুষের রায় আজ ব্যালট বাক্সে বন্দি থাকলেও, তার কম্পন অনুভূত হচ্ছে বঙ্গভবন থেকে সচিবালয় পর্যন্ত। এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে তিস্তার পানির হিস্যা থেকে শুরু করে সীমান্ত সুরক্ষা এবং কয়েক লাখ মানুষের নাগরিকত্বের ভবিষ্যৎ।

পশ্চিমবঙ্গের এই ক্ষমতার লড়াইয়ের মূল প্রতিপক্ষ দুই বিপরীত মেরুর শক্তি—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস এবং নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি। টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা তৃণমূলের জন্য এটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, আর বিজেপির জন্য এটি পশ্চিমবঙ্গকে নিজেদের ‘হিন্দুত্ববাদী’ দুর্গে পরিণত করার চূড়ান্ত চেষ্টা। ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল বড় জয় পেলেও এবার বিজেপি তাদের সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নেমেছে। অধিকাংশ বুথফেরত জরিপ বা এক্সিট পোল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ক্ষমতার চাকা ঘুরে যেতে পারে। তবে বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন কেবল সরকার বদল নয়, বরং কূটনীতির মোড় বদলে দেওয়ার এক সংকেত। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক বর্তমানে কিছুটা শীতল ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে দীর্ঘ ২০ বছর পর বিএনপি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরির চেষ্টা চলছে। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার দিল্লির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলবে নাকি বিরোধিতায় নামবে, তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের স্বার্থ।

বাংলাদেশের জন্য এই নির্বাচনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো ‘পুশ-ইন’ বা কথিত অনুপ্রবেশকারী ইস্যু। বিজেপি তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় বাংলাদেশ থেকে আসা অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু করেছে। প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে সংশোধন বা বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় দেখা গেছে, এর বড় অংশই মুসলিম। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (CAA) এবং এনআরসি (NRC) কার্যকর করার গতি আরও বাড়বে। এর ফলে একটি বড় জনগোষ্ঠীকে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত কয়েক মাসেই কয়েক হাজার মানুষকে জোর করে পুশ-ইনের চেষ্টা করা হয়েছে, যার মধ্যে খোদ ভারতীয় নাগরিকও ছিল বলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দাবি করেছে। বিজেপি জিতলে এই সীমান্ত নীতি আরও কঠোর হবে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

অন্যদিকে, তিস্তা পানি বন্টন চুক্তি নিয়ে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা অচলাবস্থার চাবিকাঠিও এই নির্বাচনের হাতে। ২০১১ সালে মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় তিস্তা চুক্তি চূড়ান্ত হলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একগুঁয়েমির কারণে তা থমকে যায়। মমতা বরাবরই দাবি করে আসছেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে বঞ্চিত করে তিনি বাংলাদেশকে পানি দিতে পারবেন না। তৃণমূল ক্ষমতায় থাকলে তিস্তার পানি পাওয়ার আশা বাংলাদেশের জন্য অনেকটা ক্ষীণ। তবে বিজেপি জিতলে এই জট খুলতে পারে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। যেহেতু ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এই চুক্তি করতে আগ্রহী, তাই রাজ্যে তাদের দলীয় সরকার থাকলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো আঞ্চলিক বাধার সম্মুখীন হতে হবে না। কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত দ্বিধা—বিজেপি এলে পানি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়লেও সীমান্ত উত্তেজনা ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চাপ বাড়বে, আর তৃণমূল থাকলে সীমান্ত স্থিতিশীল থাকলেও পানির সংকট কাটবে না।

বাণিজ্য ও মানুষের যাতায়াতের ক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের জন্য মহাগুরুত্বপূর্ণ। বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে দুই দেশের সিংহভাগ স্থলবাণিজ্য পরিচালিত হয়। চিকিৎসা, শিক্ষা এবং ব্যবসার প্রয়োজনে প্রতিদিন হাজার হাজার বাংলাদেশি কলকাতায় যান। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বা অস্থিতিশীলতার সরাসরি প্রভাব পড়ে এই পর্যটন ও চিকিৎসা খাতের ওপর। বিশেষ করে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের সমীকরণ এই যাতায়াতকে প্রভাবিত করে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রচারণার কারণে বাংলাদেশি পর্যটকদের মধ্যে এক ধরণের ভীতি কাজ করতে পারে, যা দুই দেশের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের আত্মিক সম্পর্কে ফাটল ধরাতে পারে। আবার তৃণমূল ক্ষমতায় থাকলে দিল্লির সঙ্গে বৈরী সম্পর্কের কারণে বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও মাঝে মাঝে অচলাবস্থা দেখা দিতে পারে।

পরিশেষে, পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন কেবল একটি জয়-পরাজয়ের খবর নয়, এটি আগামী কয়েক বছরের জন্য ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ব্লু-প্রিন্ট। ২০২৬ সালে গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তির মেয়াদও শেষ হচ্ছে। ফলে তিস্তা ও গঙ্গা—এই দুই বড় সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ঢাকাকে খুব সতর্কতার সাথে কলকাতার নতুন সরকারের সাথে ডিল করতে হবে। ক্ষমতার পাল্লা যেদিকেই ভারী হোক না কেন, বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জটা ভিন্ন ভিন্ন। একদিকে আছে পানিবণ্টনের মতো জীবন-মরণ প্রশ্ন, অন্যদিকে আছে সীমান্ত সুরক্ষা ও সম্মানজনক নাগরিকত্বের লড়াই। কলকাতার ভোটবাক্স থেকে বেরিয়ে আসা ফলাফল কেবল ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র নয়, বরং দুই বাংলার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক এবং মানবিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথও নির্ধারণ করে দেবে।

সূত্র: দ্যা প্রেস


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category