চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে দেশের বিভিন্ন কারাগার ভেঙে পালানো ৭ শতাধিক দুর্ধর্ষ বন্দি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই তালিকার সবচেয়ে ভয়ংকর অংশ হলো ৭০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি, যারা গত কয়েক মাস ধরে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে আত্মগোপনে রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, আরসা, জেএমবি, হুজি-বি কিংবা হিজবুত তাহ্রীরের মতো নিষিদ্ধ সংগঠনের এই সদস্যরা এখন আর আলাদা নয়, বরং পরিচয় গোপন করে একজোট হওয়ার চেষ্টা করছে। মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ বা বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে তারা নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে উগ্রবাদী তালিম দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বড় ধরনের হামলার আশঙ্কায় ইতোমধ্যেই ৮টি বিমানবন্দরসহ সারা দেশে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। গত ৫ই আগস্টের ডামাডোলে দেশের ১৭টি কারাগারে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এর মধ্যে নরসিংদী, শেরপুর ও সাতক্ষীরা কারাগার পুরোপুরি ভেঙে সব বন্দি পালিয়ে যায়। বাদ পড়েনি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি সেলও। সরকারি হিসাবমতে, মোট ২ হাজার ২৩২ জন বন্দি পালিয়েছিল, যাদের মধ্যে দেড় হাজার জন ফিরে এলেও এখনো ৭১৩ জনের কোনো হদিস নেই। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ওই সময় কারাগারগুলো থেকে ৬৭টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট করা হয়েছিল, যার মধ্যে ২৭টি অত্যাধুনিক অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই নিখোঁজ অস্ত্র ও দুর্ধর্ষ জঙ্গিদের মেলবন্ধন দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য ‘টাইমবোম’ হিসেবে কাজ করছে।
গোয়েন্দা তদন্তে উঠে এসেছে যে, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও যোগসূত্র স্থাপন করছে এই পলাতক জঙ্গিরা। সম্প্রতি তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ঢাকা থেকে চার যুবককে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। তাদের মধ্যে একজন চীন পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে বিমানবন্দরে ধরা পড়েন। এর আগে গোপালগঞ্জের দুই যুবক দুবাই যাওয়ার কথা বলে পাকিস্তানে গিয়ে টিটিপি’র হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল। এই সীমান্তহীন উগ্রবাদ এখন কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং বাস্তব এক হুমকি। জঙ্গিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের সঙ্গে আঁতাত করে দেশে নতুন করে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে এমন অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোতে থাকা বন্দি জঙ্গিদের ওপর নজরদারি বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, সিসিটিভি মনিটরিং ও সশস্ত্র পাহারার পাশাপাশি জঙ্গিদের একটি নির্দিষ্ট সুরক্ষিত জোনে রাখা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল কারাগারের ভেতর নজর রাখলেই চলবে না। বাইরে থাকা পলাতক ৭০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গির অবস্থান শনাক্ত করা এবং তাদের ডিজিটাল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা এখন সময়ের দাবি। সাবেক কারা কর্মকর্তারা বলছেন, জঙ্গিদের টেলিফোন আলাপ ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার মতো সংবেদনশীল জায়গাগুলোতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। কারণ, মুক্ত আকাশে থাকা এই ৭০ জন দুর্ধর্ষ মস্তিষ্ক যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরণের নাশকতার নীল নকশা বাস্তবায়ন করতে পারে। তাই আতঙ্কিত না হলেও, এই মুহূর্তে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক সেকেন্ডের জন্যও শিথিল করার সুযোগ নেই।