বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিদ্যুৎ খাতে যে তথাকথিত উন্নয়নের রূপকথা প্রচার করা হয়েছিল, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভয়ংকর আর্থিক ক্ষতের বাস্তব চিত্র এখন ক্রমশ দেশের মানুষের সামনে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। বিদ্যুৎ খাতের সেই দৃশ্যমান কাঠামোগত উন্নয়নের সবচেয়ে বড় এবং নেতিবাচক দিক হলো অসম, অযৌক্তিক এবং চরম জনস্বার্থবিরোধী বেশ কিছু মেগা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ এখন গভীরভাবে এই চুক্তিগুলোর ভয়াবহতা ও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব অনুধাবন করতে পেরেছে। তারা অত্যন্ত জোরালোভাবে মনে করছে যে, রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকার নির্মম অপচয় রোধ করতে হলে এসব চুক্তির পুঙ্খানুপুঙ্খ পুনর্মূল্যায়ন এবং কাঠামোগত সংশোধনের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে ভারত ও চীনের সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে নির্মিত বড় কয়লাভিত্তিক ও অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তিগুলো বর্তমানে দেশের অর্থনীতির জন্য আক্ষরিক অর্থেই একটি প্রাণঘাতী ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক পালাবদলের পর এই দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক চুক্তিগুলোর ভেতরে সযত্নে লুকিয়ে রাখা ফাঁকফোকর এবং রাষ্ট্রবিরোধী শর্তগুলো যখন একে একে বেরিয়ে আসছে, তখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি পরিচালনাকারী নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের দীর্ঘ ও নিবিড় পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, এই মেগা চুক্তিগুলোতে এমন কিছু কারিগরি এবং আর্থিক শর্ত অত্যন্ত সুকৌশলে যুক্ত করা হয়েছিল, যা উচ্চ ট্যারিফ বা বিদ্যুতের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধির জন্য সরাসরি ও প্রধানভাবে দায়ী। এর মধ্যে অন্যতম একটি শর্ত হলো ‘রিটার্ন অন ইক্যুইটি’ বা বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার হার। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার খোঁড়া যুক্তিতে এই হার এমন একটি পর্যায়ে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বর্তমান বৈশ্বিক মানদণ্ড ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় অত্যন্ত বেশি এবং সম্পূর্ণ একপেশে। এর পাশাপাশি চুক্তিতে যুক্ত রয়েছে নন-আরওই খরচের বিশাল বোঝা, যা মূলত অব্যবস্থাপনাজনিত ক্ষতি বা অন্যান্য অদৃশ্য ব্যয় হিসেবে দেখানো হয় এবং এর সম্পূর্ণ দায়ভার চাপানো হয় বাংলাদেশের ঘাড়ে। আরও রয়েছে অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স বা ওঅ্যান্ডএম খরচ। এই দৈনন্দিন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি ধরা হয়েছে চুক্তিতে, যার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। তাপ হার বা হিট রেটের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি বিষয়গুলোতেও এমন সব প্রতিকূল শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যেখানে প্ল্যান্টের জ্বালানি দক্ষতার চেয়ে বিদেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের অতিমুনাফাকেই একচেটিয়াভাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের বিশেষজ্ঞরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, শুধুমাত্র দ্বিপাক্ষিক ও নিবিড় কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে যদি এই কারিগরি ও আর্থিক ত্রুটিগুলো সংশোধন করা যায় এবং ট্যারিফ একটি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা যায়, তবে প্রতি বছর রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
এই অসম ও অযৌক্তিক চুক্তিগুলোর কারণে বাংলাদেশ সরকারকে এখন ভর্তুকির এক বিশাল, অভাবনীয় ও অকল্পনীয় বোঝা দিনের পর দিন বহন করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তৈরি করা একটি সাম্প্রতিক ও বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আর্থিক পরিস্থিতি এমন এক খাদের কিনারে গিয়ে পৌঁছেছে যে, শুধুমাত্র ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের শেষ তিন মাস অর্থাৎ এপ্রিল ২০২৬ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত সময়ের জন্যই সরকারের ১৮ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা বিশাল অঙ্কের ভর্তুকির প্রয়োজন হবে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ মূলত ব্যয় হবে জয়েন্ট ভেঞ্চার বা যৌথ মালিকানাধীন কয়লাভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র যেমন বিসিপিসিএল, বিআইএফপিসিএল এবং আরএনপিএল-এর বিশাল বিল মেটানোর পেছনে। এর সঙ্গে অবশ্য যুক্ত রয়েছে পিডিবির আওতাধীন বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি এবং ভারত ও নেপাল থেকে সরাসরি আমদানি করা বিদ্যুতের বিপুল ব্যয়। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, ভর্তুকির এই পরিসংখ্যান এখানেই থেমে থাকছে না, বরং আগামী অর্থবছরে তা আরও ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক রূপ নিতে যাচ্ছে। চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে মোট ভর্তুকির পরিমাণ যেখানে ১৫ হাজার ১৭০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে, সেখানে আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে এই ভর্তুকির সম্ভাব্য আকার বেড়ে দাঁড়াতে পারে পাহাড়সম ৪২ হাজার ৪৪০ কোটি টাকায়। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ভর্তুকির পরিমাণ দ্বিগুণেরও অনেক বেশি বৃদ্ধি পাওয়ার এই প্রক্ষেপণ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত, যা যেকোনো দেশের সাধারণ বাজেট কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
সার্বিক এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির জন্য মূলত ৬৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ৬৮টি কেন্দ্রের দীর্ঘ তালিকার মধ্যে রয়েছে ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের মতো বিশাল বিদেশি প্ল্যান্ট, দেশি-বিদেশি যৌথ উদ্যোগের বড় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র, পিডিবির আওতাধীন প্রায় ৬০৯৪ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ৩৮টি বেসরকারি রেন্টাল ও আইপিপি (ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) এবং ৪৯৭১ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১৭টি রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘ইনডেমনিটি অ্যাক্ট’ বা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি বিশেষ আইনের মতো একটি অগণতান্ত্রিক ঢাল ব্যবহার করে, কোনো ধরনের প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই এসব চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছিল। অত্যন্ত চড়া দামে বিদ্যুৎ কেনার ফলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবি যে বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, তার বড় একটি অংশ আবার অর্থ বিভাগ থেকে নগদ হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে না। এর কারণ হলো, বিগত সরকারের চরম অস্বচ্ছতার কারণে এসব বিপুল পরিমাণ ব্যয় অর্থ বিভাগের নিয়মিত ভর্তুকি তালিকার অন্তর্ভুক্তই করা হয়নি। এই ভয়াবহ আর্থিক তারল্য সঙ্কট সামাল দিতে বিদ্যুৎ বিভাগ বাধ্য হয়ে ভারত, চীন ও নেপাল থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎসহ ওই ৬৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে অর্থ বিভাগের মূল ভর্তুকির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে। অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির আসন্ন বৈঠকে এই প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করার কথা রয়েছে।
এই বিদ্যুৎ সঙ্কটের মূলে থাকা ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত জটিল, সংবেদনশীল এবং বহুমাত্রিক। ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি গ্রুপের ১৪৯৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত এবং দেশের মানুষের ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে। আদানির সঙ্গে সম্পাদিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিটি শুরু থেকেই ছিল চরম বিতর্কিত ও রহস্যময়। এই চুক্তিতে কয়লার দাম নির্ধারণের পদ্ধতি, ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্রভাড়া এবং অন্যান্য শর্তগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যা কেবল একটি পক্ষেরই, অর্থাৎ আদানির ব্যবসায়িক স্বার্থ শতভাগ রক্ষা করে। বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য আদানির এই অসম চুক্তি সংশোধন করা কেবল একটি অভ্যন্তরীণ আর্থিক বা আইনি চ্যালেঞ্জ নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও স্নায়ুক্ষয়ী কূটনৈতিক পরীক্ষাও বটে। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে দেশের ন্যায্য স্বার্থ আদায় করার এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্র বা রামপালের ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিআইএফপিসিএল-এর ট্যারিফ কাঠামো নিয়েও নতুন করে দরকষাকষির তীব্র প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে পরাশক্তি চীনের অর্থায়নে নির্মিত বিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অবস্থাও বাংলাদেশের জন্য সমানভাবে শ্বাসরুদ্ধকর। পটুয়াখালীতে নির্মিত আরএনপিএল এবং পায়রার বিসিপিসিএল—উভয় কেন্দ্রেই ১৩২০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু এই জয়েন্ট ভেঞ্চারগুলোর চুক্তিতে ‘টেক অর পে’ নামের এমন এক সর্বনাশা ও একপেশে শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের হাত-পা আক্ষরিক অর্থেই শৃঙ্খলিত করে ফেলেছে। এই ‘টেক অর পে’ শর্তের সহজ অর্থ হলো, বাংলাদেশ যদি চাহিদার অভাবে ওই কেন্দ্রগুলো থেকে এক ইউনিট বিদ্যুৎ গ্রহণ নাও করে, তবুও তাদের কেন্দ্রভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে প্রতি বছর রাষ্ট্রকে শত শত কোটি টাকা জরিমানা বা ভাড়া গুনতে হবে। বিদ্যুৎ বিভাগ এখন মরিয়া হয়ে এই জয়েন্ট ভেঞ্চারগুলোর পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নন-আরওই ব্যয়ের মতো কারিগরি পয়েন্টগুলোতে কাঁচি চালাতে চাইছে। উদ্দেশ্য একটাই, যেকোনো মূল্যে দরকষাকষি করে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনা। কিন্তু চীনের মতো বৃহৎ উন্নয়ন অংশীদার ও ভূরাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির শর্ত পরিবর্তন করতে হলেও প্রয়োজন হবে অত্যন্ত পরিপক্ব, কৌশলগত ও দূরদর্শী কূটনৈতিক পদক্ষেপ।
বিদ্যুৎ খাতের এই সীমাহীন ও লাগামহীন বিশৃঙ্খলা কেবল এই একটি খাতের মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ক্যান্সারের মতো পুরো সামষ্টিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়েছে এবং প্রতিটি স্তরে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। অর্থনীতির বিভিন্ন সামষ্টিক সূচক গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ এবং গ্যাস ও জ্বালানি সঙ্কটের কারণে দেশে শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সাম্প্রতিক ডেটাবেজ ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনক হারে কমে মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। প্রবৃদ্ধির এই হতাশাজনক নিম্নগতির অন্যতম প্রধান কারণ হলো শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের চরম অভাব এবং অতিরিক্ত উৎপাদন ব্যয়। শিল্পের চাকা সচল রাখতে না পারার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়েছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের ওপর। শিল্পের কাঁচামাল ও এলসি বা ঋণপত্র খোলার তথ্য বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে; দেশে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ২৫ দশমিক ৪২ শতাংশের বিশাল পতন ঘটেছে। এর সোজা ও ভয়ংকর অর্থ হলো, দেশে নতুন কোনো শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে না এবং পুরোনো কারখানারও কোনো ধরনের আধুনিকায়ন বা সম্প্রসারণ হচ্ছে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটানোর পথে এই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কট এখন সবচেয়ে বড় জাতীয় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের শিল্প খাতের চাকা সচল রাখতে হলে বিদ্যুতের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে কমানো এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা যে কতটা জরুরি, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো ও হতাশাজনক। উচ্চ ভর্তুকির চাপে পিষ্ট সরকার যখন পিডিবিকে সময়মতো প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় করতে পারছে না, তখন পিডিবিও বাধ্য হয়ে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল অঙ্কের বিল মাসের পর মাস বকেয়া রাখছে। মাসের পর মাস বিল না পাওয়ার কারণে অনেক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র তাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি, কয়লা বা ফার্নেস অয়েল আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কিনতে পারছে না। মূলধন সঙ্কটে পড়ে বাধ্য হয়ে তারা উৎপাদন আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিচ্ছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলে দেশে স্বাভাবিকভাবেই লোডশেডিং বাড়ছে, যা আবার ঘুরেফিরে সেই শিল্প উৎপাদনকেই ব্যাহত করছে এবং পুরো অর্থনীতিকে স্থবির করে দিচ্ছে। এটি এমন এক দুষ্টচক্র, যা থেকে বের হওয়া অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। পতিত সরকারের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত, দুর্নীতির মহোৎসব এবং ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য করা এই অসম চুক্তিগুলোই আজ পুরো জাতিকে এই খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে।
এই অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সঙ্কটের সঙ্গে এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাত। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচলের সঙ্কটের কারণে আন্তর্জাতিক বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যেকোনো সময় ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের এই অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের মতো প্রায় সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক ঝুঁকি। এই অবস্থায় আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানি বা সরাসরি বিদেশি বিদ্যুতের ওপর অন্ধ নির্ভরতা কমানোর কোনো বিকল্প নেই। এর জন্য সরকারের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ‘স্মার্ট রিব্যালান্সিং’ বা কৌশলগত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা। চীন ও ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন করে দরকষাকষির ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি জ্বালানি বহুমুখীকরণের দিকে জোর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। আগামী ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকে নেপাল থেকে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জলবিদ্যুৎ আমদানির যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এর পাশাপাশি শ্রীপুর প্রকল্পের মতো নিজস্ব উদ্যোগ এবং সারা দেশে সৌরশক্তি ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে ব্যাপক দেশীয় বিনিয়োগ ও মনোযোগ দেওয়া একান্ত প্রয়োজন।
স্থায়ীভাবে এই বিদ্যুৎ ও অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে এখন কঠোর, সাহসী এবং যুগান্তকারী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। প্রথমত, বিগত সরকারের আমলে করা ‘ইনডেমনিটি অ্যাক্ট’ বা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি বিশেষ আইনের মতো সব কালো আইনের অধীনে করা সব চুক্তি অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে চুলচেরা বিশ্লেষণ বা স্ক্রুটিনি করতে হবে। যেসব চুক্তিতে স্পষ্টতই জাতীয় স্বার্থবিরোধী ধারা রয়েছে, তা অবিলম্বে বাতিল বা আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে সংশোধন করার উদ্যোগ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় অভিশাপ ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ প্রথা থেকে চিরতরে বেরিয়ে আসতে হবে। ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পে’ অর্থাৎ বিদ্যুৎ না নিলে কোনো টাকা দেওয়া হবে না—শুধুমাত্র এই যুক্তিসঙ্গত ভিত্তিতে নতুন করে সব চুক্তির ট্যারিফ নির্ধারণ করতে হবে। সবশেষে নির্দ্বিধায় বলতে হয়, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া বিদ্যুৎ খাতের এই ‘বিষফোঁড়া’ এখন পুরো দেশের অর্থনীতির নীরব রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। ১৮ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকার তিন মাস মেয়াদি ভর্তুকি কেবল একটি বিশাল হিমশৈলের দৃশ্যমান চূড়া মাত্র। যদি এখনই বড় বড় জয়েন্ট ভেঞ্চার এবং আদানির মতো চুক্তিগুলো সাহসিকতার সঙ্গে সংশোধন করা না যায়, তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৪২ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির এই বিশাল ও অকল্পনীয় বোঝা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে পুরোপুরি ধসিয়ে দিতে পারে। তাই বিদ্যুৎ বিভাগের এই সাহসী প্রস্তাবনাগুলো দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়ন করা এখন কেবল কোনো সাধারণ আর্থিক বিষয় নয়, বরং এটি সার্বভৌম জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার এক চূড়ান্ত লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: দৈনিক নয়া দিগন্ত