• রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ০৪:১৩ পূর্বাহ্ন
Headline
পায়ের নিচে পৃথিবী বিদ্যুৎ সঞ্চালনে ধারাবাহিক লোকসান: ঋণ ৬০ হাজার কোটি, সংকটে পাওয়ার গ্রিড সুপার এল নিনোর ছায়া ও জলবায়ুর খামখেয়ালিপনা: চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ নাইজেরিয়ায় স্কুলে বন্দুকধারীদের তাণ্ডব: ক্লাস চলাকালে বহু শিক্ষার্থী অপহরণ হরমুজ প্রণালী নিয়ে জাতিসংঘের প্রস্তাবে ইরানের তীব্র ক্ষোভ, বিশ্ববাসীকে ‘কঠোর বার্তা’ তেহরানের ট্রাম্প ফিরতেই বেইজিং যাচ্ছেন পুতিন: দুই পরাশক্তির বৈঠকে নজর বিশ্ব মহলের নগরের দায়িত্ব পেলে নাগরিক সেবাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবো: সাদিক কায়েম আস্থার চরম সংকটে দেশের আর্থিক খাত: ৬৬% ব্যাংকই দুর্বল, আসল টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে শঙ্কা নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল ঘোষণা পাকিস্তানের, পাঁচ নতুনের অভিষেক বিসিবির অ্যাডহক কমিটি বাতিলের দাবিতে এবার বুলবুল-ফারুকদের রিট

আস্থার চরম সংকটে দেশের আর্থিক খাত: ৬৬% ব্যাংকই দুর্বল, আসল টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে শঙ্কা

Reporter Name / ৫ Time View
Update : শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

শেয়ারবাজার, লিজিং কোম্পানি, বিমা ও সমবায় খাতের মতো দেশের মূল ব্যাংকিং খাতও এখন সাধারণ মানুষের জমানো টাকার জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র ব্যাংক বাদে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখলে লভ্যাংশ পাওয়া তো দূরের কথা, মূল আসল টাকা ফেরত পাওয়া নিয়েই চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য এবং অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ বলছে—দেশের আর্থিক খাতের রোগটি এখন আর কেবল খেলাপি ঋণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে।

রেকর্ড খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০.৬০ শতাংশ। তবে বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা, কারণ দীর্ঘদিন ধরে বহু ব্যাংক তাদের খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য গোপন করে আসছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের সচল ৬২টি ব্যাংকের মধ্যে ৬৬ শতাংশই (অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ) এখন চরম দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। এর মধ্যে ১২টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৭০ শতাংশের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। ইতোমধ্যে ২৩টি ব্যাংকে মূলধনের ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৳৮২ হাজার কোটি টাকা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর; ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা ব্যাংক থেকে নিজেদের বৈধ টাকা তুলতে গিয়ে প্রতিনিয়ত চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

লুটপাট ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার যোগসাজশের অভিযোগ

ব্যাংকিং খাতের এই মরণদশার পেছনে সুশাসনের অভাব এবং পরিকল্পিত লুটপাটকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. এমকে মুজেরী বলেন, “ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই), শেয়ারবাজার এবং বিমাসহ পুরো আর্থিক খাতেই এখন তীব্র আস্থার সংকট চলছে। নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, অথচ তারাই আবার ব্যাংকের মালিক সেজে বসে আছে। আর এই লুটপাটের পেছনে খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থারও এক ধরনের যোগসাজশ ছিল। কোনো কোনো ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৮০ শতাংশ পার হয়ে গেছে।”

এই সংকট থেকে উত্তরণে ড. মুজেরী দুটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন:

১. জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত কঠোর শাস্তির আওতায় আনা।

২. লুটেরাদের কাছ থেকে পাচার হওয়া অর্থ আদায়ের দ্রুত ব্যবস্থা করা।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল ইসলাম জানান, এই সংকট অনেক গভীরের। সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে যেভাবে আকস্মিকভাবে সরানো হয়েছে, তা সাধারণ আমানতকারীদের মনে ব্যাংকিং খাতের প্রতি অনাস্থা ও আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

আস্থা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি’

এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের আস্থা ফেরানোই প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। তিনি জানান, বড় অঙ্কের পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে একটি বিশেষ ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি’ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

মুখপাত্র আরও জানান, নতুন করে যাতে কোনো বেনামি বা ভুয়া ঋণ তৈরি না হতে পারে, সেজন্য কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং বিভিন্ন দুর্বল ব্যাংকের পর্ষদে নতুন করে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ছোট ও বড় সব ধরনের খেলাপি ঋণের যৌক্তিকতা কঠোরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

লাল তালিকায় ২০ আর্থিক প্রতিষ্ঠান: অবসায়নের পথে ৬টি

ব্যাংকের পাশাপাশি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক খাতের (লিজিং কোম্পানি) অবস্থাও এখন অত্যন্ত শোচনীয়। বর্তমানে ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান রেড জোনে (লাল তালিকা) রয়েছে। এর মধ্যে—এফএএস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং—এই ৬টি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণভাবে অবসায়নের (বন্ধ) ঘোষণা আসতে পারে।

নিজেদের জমানো আমানত ফেরত পাওয়ার দাবিতে এই ৬টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১২ হাজারেরও বেশি গ্রাহক এখন নিরুপায় হয়ে রাজপথে আন্দোলনে নেমেছেন। তথ্যমতে, এসব প্রতিষ্ঠানে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ৩৬ শতাংশ বা ২৮ হাজার কোটি টাকাই এখন পুরোপুরি খেলাপি হয়ে গেছে।

একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো তার ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত। কিন্তু বর্তমান চিত্র বলছে, সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্র ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ২০২৬ সালের এই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে কেবল কমিটি গঠন বা আশ্বাস দিয়ে গ্রাহকদের ক্ষোভ ও আতঙ্ক দূর করা সম্ভব নয়। যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে লুটেরাদের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার করা না যায়, তবে দেশের পুরো আর্থিক দেওয়ালটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।



আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category