ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় ও আলোচিত অভিনেত্রী পরীমনি মানেই যেন রূপালি পর্দার গ্ল্যামার আর ব্যক্তিগত জীবনের নানা বৈচিত্র্যের এক মেলবন্ধন। তবে অভিনয়ের বাইরেও এফডিসির (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন) অস্বচ্ছল সহশিল্পীদের কাছে তিনি বরাবরই এক নির্ভরতার প্রতীক হয়ে ছিলেন। একটা সময় ছিল যখন প্রতি বছর ঈদুল আজহায় পরীমনির উদ্যোগে এফডিসিতে বিশাল আয়োজনে কোরবানি দেওয়া হতো। তার দেওয়া সেই কোরবানির গোশত পেয়ে ঈদের দিনে হাসি ফুটত এফডিসির অসংখ্য এক্সট্রা, প্রোডাকশন বয়, মেকআপম্যান এবং নিম্ন আয়ের কলাকুশলীদের মুখে। এটি যেন এফডিসির একটি অলিখিত ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে সেই চেনা দৃশ্যপট আর চোখে পড়ছে না। এবারও এফডিসিতে কোরবানি দিচ্ছেন না এই লাস্যময়ী অভিনেত্রী। তবে নিজে উপস্থিত না থাকলেও, এফডিসির সেই চেনা মুখগুলোর প্রতি তার ভালোবাসা ও টান একটুও কমেনি। এবার কোরবানি নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অনুভূতির কথা জানিয়েছেন তিনি, যেখানে এফডিসির মায়ার পাশাপাশি মিশে আছে নিজ শেকড় ও প্রয়াত নানার প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা।
সম্প্রতি গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে পরীমনি এফডিসিতে কোরবানি না দেওয়ার কারণ এবং তার বর্তমান ভাবনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। তিনি বলেন, “আমি চাই এফডিসিতেও কোরবানিটা হোক। ২০১৬ সাল থেকে সবসময় কোরবানিটা এফডিসির সঙ্গেই করেছি। এবার নিয়ে হয়তো চার বছর হয়ে গেল আমি এফডিসিতে কোরবানি দিচ্ছি না। এর নানা কারণ আছে, সেগুলো এখন সবার কাছে পরিষ্কার।” তবে নিজের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও সহশিল্পীদের আনন্দ যেন ম্লান না হয়, সে বিষয়ে তিনি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ভাষায় বলেন, “আমি চাই আমার সহশিল্পীরা, যাদের অনেকেই দরিদ্র হিসেবে পরিচিত, তারাও যেন উৎসবমুখরভাবে ঈদ উদযাপন করতে পারেন। আমি থাকি আর না থাকি, এফডিসিতে তাদের আনন্দটা যেন অটুট থাকে।”
এফডিসিকে একসময় নিজের সেকেন্ড হোম ভাবলেও, এবার দীর্ঘ বিরতির পর পরীমনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নিজের শেকড়ে, অর্থাৎ নিজ গ্রামের বাড়িতে গিয়ে ঈদ উদযাপন করার। তার এই সিদ্ধান্তের পেছনে জড়িয়ে আছে এক আবেগঘন কারণ। পরীমনির জীবনে তার নানার স্থান ছিল সবার ওপরে, যিনি ছিলেন তার সবচেয়ে বড় ছায়া। নানার সেই না-বলা ইচ্ছার কথা স্মরণ করে এই অভিনেত্রী বলেন, “আমার নানুভাই সবসময় চাইতেন আমি যেন বাড়ি গিয়ে পরিবারের সবার সঙ্গে ঈদ করি। নিজের হাতে কোরবানির মাংস যেন আমি সবাইকে বিলিয়ে দিই। প্রায় আট-নয় বছর শুধু এফডিসির মানুষদের কথা ভেবে আমার আর বাড়িতে যাওয়া হয়নি।” এফডিসির দায়িত্ব থেকে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নেওয়ার পেছনের মানসিক স্বস্তির কথাও জানিয়েছেন তিনি। একসময় মনে হতো তিনি না থাকলে হয়তো এফডিসির ওই দরিদ্র মানুষগুলোর ঈদ আনন্দে ভাটা পড়বে। কিন্তু সেই শূন্যস্থান পূরণে অন্য কেউ এগিয়ে আসায় তিনি স্বস্তি পেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “পরে মনে হয়েছে, এফডিসির ওই দায়িত্বটা এখন অন্য কেউ সামলাচ্ছে বলেই আমি দায়িত্বটা তাদের হাতে হ্যান্ডওভার (হস্তান্তর) করতে পেরেছি। এরপর থেকেই মূলত আমি আবার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে ঈদ করা শুরু করি।”
সবশেষে, কেবল নিজের পরিবার নয়, বরং সমাজের প্রতিটি মানুষের মাঝে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার এক সর্বজনীন ইচ্ছার কথা জানান পরীমনি। তারকাখ্যাতির অহংকার সরিয়ে রেখে তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলেন, “আমি জানি না কতটুকু কীভাবে করতে পারছি, তবে আমার জায়গা থেকে আমি চেষ্টা করছি ঈদটাকে উৎসবমুখর করতে। ঈদ মানুষের জীবনে আনন্দ আর খুশির বার্তা নিয়ে আসে। আমি চাই সবার মুখে হাসি থাকুক, সবার অন্তরে আনন্দ থাকুক। এর বাইরে আমার আর কোনো চাওয়া নেই।” পরীমনি হয়তো এখন আর এফডিসির প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে নিজ হাতে গোশত বিলি করেন না, কিন্তু তার এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, চলচ্চিত্রের সেই খেটে খাওয়া মানুষগুলোর প্রতি তার মায়া ও ভালোবাসা আজও অমলিন। একইসাথে, নানার ইচ্ছা পূরণ করে নিজ গ্রামের সাধারণ মানুষের সাথে ঈদ কাটানোর এই সিদ্ধান্ত তাকে শেকড়সন্ধানী এক অন্য পরীমনি হিসেবেই নতুন করে সবার সামনে তুলে ধরল।