আরবি চান্দ্রবর্ষের সর্বশেষ মাস জিলহজ। ইসলামি শরিয়তে এই মাসের প্রথম দিককার দিনগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। কোরআন ও হাদিসে জিলহজ মাসের প্রথম ১৩ দিনের বিশেষ কিছু আমলের কথা বর্ণিত আছে, যা নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
জিলহজ মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো হজ করা, যা ইসলামের মৌলিক পাঁচটি স্তম্ভের একটি। হজের মূল কার্যক্রমগুলো ৮ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজের মধ্যে সম্পন্ন করতে হয়। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের ওপর জীবনে অন্তত একবার হজ করা ফরজ। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন,
“মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই গৃহের হজ করা তার জন্য অবশ্যকর্তব্য…” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭)
জিলহজ মাসের আরেকটি ওয়াজিব আমল হলো কোরবানি, যা ১০, ১১ বা ১২ তারিখে আদায় করতে হয়। নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক, সাবালক ও সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারীর ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। আল্লাহ তায়ালা সরাসরি কোরবানির নির্দেশ দিয়ে বলেছেন,
“তুমি তোমার রবের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো এবং কোরবানি করো।” (সুরা কাউসার, আয়াত: ২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে বলেছেন, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানি করে না, সে যেন ঈদগাহের ধারেকাছেও না আসে।
জিলহজের প্রথম ১০ দিনের যেকোনো নেক আমল আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। এ সম্পর্কে বুখারি শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“আল্লাহর কাছে জিলহজের ১০ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই।”
তাই এই সময়ে দান-সদকা, জিকির, নফল নামাজসহ বেশি বেশি নেক আমল করা এবং গুনাহ থেকে বিরত থাকা জরুরি।
জিলহজের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখা মুস্তাহাব। তিরমিজি শরিফের হাদিস অনুযায়ী, এই দিনগুলোর প্রতিটি রোজা এক বছরের নফল রোজার সমতুল্য এবং প্রতিটি রাতের ইবাদত লাইলাতুল কদরের ইবাদতের সমান। পুরো ৯ দিন বা ১০ রাত সম্ভব না হলে, সাধ্যমতো রোজা ও ইবাদত করলেও এর সওয়াব পাওয়া যাবে।
বিশেষ করে ৯ জিলহজ (আরাফার দিন) রোজা রাখলে তা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। রাসুল (সা.) বলেছেন, এই এক দিনের রোজার বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা পেছনের এক বছর এবং সামনের এক বছরের গুনাহ (সগিরা গুনাহ) ক্ষমা করে দেবেন। (মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)
যাঁরা কোরবানি করার ইচ্ছা পোষণ করেছেন, তাঁদের জন্য জিলহজের চাঁদ ওঠার পর থেকে কোরবানি সম্পন্ন করা পর্যন্ত নখ, চুল বা শরীরের পশম কাটা থেকে বিরত থাকা মুস্তাহাব। তবে যিনি কোরবানি করতে অক্ষম, তিনি যদি ঈদের দিন নখ-চুল কাটেন, তবে তিনিও একটি পূর্ণ কোরবানির সওয়াব পাবেন বলে হাদিসে উল্লেখ আছে।
৯ জিলহজ ফজর থেকে শুরু করে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত (মোট ২৩ ওয়াক্ত) প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর একবার ‘তাকবিরে তাশরিক’ পড়া ওয়াজিব। এটি একাকী, জামাতে, নারী, পুরুষ, মুকিম বা মুসাফির—সবার জন্যই প্রযোজ্য (পুরুষরা জোরে পড়বেন)।
তাকবিরটি হলো:
“আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ।”
১০ জিলহজ ঈদুল আজহার দুই রাকাত নামাজ আদায় করা সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন প্রতিটি মুসলিম পুরুষের ওপর ওয়াজিব। সূর্যোদয়ের ২০-৩০ মিনিট পর থেকে দ্বিপ্রহরের আগ পর্যন্ত এই নামাজ পড়া যায়। তবে কোরবানির সুবিধার্থে ঈদের নামাজ একটু তাড়াতাড়ি আদায় করাই উত্তম।
জিলহজ মাসের এই দিনগুলো প্রতিটি মুমিনের জন্য আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য ও অশেষ সওয়াব লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ।