বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে জনসংখ্যার কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এক নজিরবিহীন ও বড় ধরনের প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কর্তৃক উত্থাপিত ‘অস্বাভাবিক জনসংখ্যাগত পরিবর্তন’ সংক্রান্ত উদ্বেগের জের ধরে ইতিমধ্যেই ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি উচ্চপর্যায়ের শক্তিশালী কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি কেবল দুই দেশের সীমান্ত অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ভারতের প্রধান প্রধান মহানগর ও শিল্পাঞ্চলগুলোর জনসংখ্যার ধরণ, অভিবাসন প্রবণতা এবং এর ফলে জাতীয় নিরাপত্তায় কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তাও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করবে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া টুডে’-র এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ভারতের বিভিন্ন স্পর্শকাতর সীমান্তবর্তী জেলা ও বড় শহরগুলোতে দ্রুত পরিবর্তনশীল জনসংখ্যাগত প্রবণতা আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে মোদি সরকার। গত বছরের ১৫ই আগস্ট দিল্লির ঐতিহাসিক লালকেল্লা থেকে দেওয়া জাতির উদ্দেশে ভাষণে নরেন্দ্র মোদি দেশের কিছু অঞ্চলে ‘অস্বাভাবিক জনসংখ্যাগত পরিবর্তন’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সেই বার্তার পর থেকেই ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টিকে সর্বোচ্চ জাতীয় গুরুত্ব দিয়ে দেখা শুরু করে।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের মতে, সীমান্ত অঞ্চলে জনসংখ্যার এই পরিবর্তন কেবল সাধারণ কোনো ডেমোগ্রাফিক শিফট বা সংখ্যাগত রদবদল নয়; বরং এর সাথে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক ভারসাম্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক পরিকল্পনা সরাসরি জড়িত। এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনার জন্য গত ২৬শে মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি প্রকাশ প্রভাকর নাওলেকারের নেতৃত্বে এই উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি গঠন করে।
সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র ও সমবায়মন্ত্রী অমিত শাহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যোষ্ঠ কর্মকর্তা এবং গোয়েন্দা প্রধানদের নিয়ে একটি বিশেষ পর্যালোচনা বৈঠক করেছেন। সেখানে এই কমিটির কাজের অগ্রগতি এবং মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কমিটি ইতিমধ্যেই তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক সম্পন্ন করেছে এবং এক বছরের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে।
আগামী কয়েক মাসে এই কমিটির সদস্যরা ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত জেলা এবং বড় শহরগুলো সরেজমিন পরিদর্শনে যাবেন। পরিদর্শনের সময় কমিটির সদস্যরা স্থানীয় জেলা প্রশাসন, বিএসএফসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করবেন। এছাড়া পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য ভারতের সর্বশেষ আদমশুমারির তথ্য, ভোটার তালিকা, জাতীয় নাগরিক পঞ্জি, অভিবাসন-সংক্রান্ত নথি এবং সরকারি বিভিন্ন ডিজিটাল ডেটাবেসও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হবে।
ভারতীয় কর্মকর্তাদের মতে, স্বাভাবিক জন্মহার, মৃত্যুহার বা অর্থনৈতিক কারণে অভিবাসন হওয়াটা সাধারণ বিষয়। কিন্তু মোদি সরকারের মূল নজর তথাকথিত ‘অস্বাভাবিক জনসংখ্যাগত পরিবর্তন’-এর ওপর। তারা আশঙ্কা করছেন, অবৈধ অনুপ্রবেশ বা নিয়ন্ত্রণহীন অভিবাসনের কারণে কোনো সুনির্দিষ্ট অঞ্চলের জনসংখ্যার ভারসাম্যে যদি কৃত্রিম পরিবর্তন আসে, তবে তা স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো, সম্পদের বণ্টন এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি আঘাত হানতে পারে।
ভারত সরকারের গঠিত এই কমিটির কাজের একটি বড় এবং প্রধান অংশ জুড়ে থাকবে ভারত-বাংলাদেশ ও ভারত-پاکستان সীমান্তবর্তী জেলাগুলো। বিগত বছরগুলোতে ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিজেপি ও তাদের সমমনা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আসাম, পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ এবং জনসংখ্যার গঠনে ব্যাপক পরিবর্তনের অভিযোগ তুলে নিয়মিত সরব থেকেছে। পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের এই সীমান্ত জেলাগুলোর রাজনৈতিক মেরুকরণ রুখতেই মূলত এই কমিটি কাজ করবে।
অবশ্য কমিটির কার্যপরিধি শুধু সীমান্তে আটকে নেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, ভারতের বড় বড় মহানগর ও শিল্পকেন্দ্রগুলোও এই গবেষণার আওতায় থাকবে। ভারতের রাজধানী দিল্লি, অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বাই, আইটি হাব বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, নয়ডা, গুরুগ্রাম, আহমেদাবাদ এবং পুনের মতো শহরগুলোতে দেশ-বিদেশ থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ আসে। এসব মেগা সিটিতে বৈধ ও অবৈধ উভয় ধরনের অভিবাসনের ধরণও কমিটি কঠোরভাবে পর্যালোচনা করবে। সরকারি সূত্রের মতে, দ্রুত নগরায়ণ এবং নিয়ন্ত্রণহীন অভিবাসন ভারতের কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জনসেবা ও স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে।
দিল্লির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টিকে কেবল একটি সাধারণ জনসংখ্যা গবেষণার বিষয় হিসেবে দেখছে না, বরং একে জাতীয় নিরাপত্তার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিচার করছে। ভারতের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অতীতে একাধিকবার অভিযোগ করেছে যে, স্পর্শকাতর সীমান্ত জেলাগুলোতে অবৈধ অনুপ্রবেশের পর জাল পরিচয়পত্র তৈরি, ভোটার তালিকায় অননুমোদিত ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্তি এবং সুপরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট এলাকায় সংঘবদ্ধ বসতি গড়ে তোলার প্রবণতা বাড়ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, জনসংখ্যাগত এই বড় পরিবর্তনের মূল কারণ সময়মতো চিহ্নিত করা এবং দ্রুত সংশোধনমূলক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া ভারতের জাতীয় স্বার্থ ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। এই উচ্চপর্যায়ের কমিটি মূলত চারটি মূল লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে: সীমান্ত জেলাগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির আসল প্রবণতা বের করা, সম্ভাব্য অবৈধ অভিবাসন ও অনুপ্রবেশের ঘটনা খতিয়ে দেখা, মহানগরগুলোতে জনসংখ্যার বাড়তি চাপ মূল্যায়ন করা এবং ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক নীতি ও কড়া আইন প্রণয়নের জন্য সরকারের কাছে বিশেষ সুপারিশ প্রস্তাব করা। এর পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্য সরকার, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং বিশেষজ্ঞ থিংক ট্যাংকগুলোর মতামতও সংগ্রহ করবে এই কমিটি।