দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমান্বয়ে অবনতি ঘটায় জনমনে গভীর শঙ্কা, ভয় ও চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে দেশের অপরাধচিত্রের এক লোমহর্ষক ও ভয়াবহ পরিসংখ্যান জনসমক্ষে এসেছে, যার মূল শিরোনাম ছিল ‘১০ কিইলিংস আ ডে ফুয়েল কনসার্নস ওভার ল অ্যান্ড অর্ডার’ (দিনে ১০ খুন আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে)। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দল, মাঠপর্যায়ে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ বা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য দিবালোকে গোলাগুলি, সুপরিকল্পিত টার্গেট কিলিং এবং সশস্ত্র হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এই চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সংগৃহীত সাম্প্রতিক অপরাধ নথি অনুযায়ী, গত মাত্র তিন মাসে দেশব্যাপী অন্তত ৯১৫টি সুনির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিবদ্ধ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যানকে সাধারণ হিসাবে আনলে দেখা যায় যে, দেশের কোথাও না কোথাও প্রতিদিন গড়ে ১০ জনেরও বেশি মানুষ নৃশংসভাবে খুনের শিকার হচ্ছেন। অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিদিন গড়ে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা নয় এবং এটি দেশের সামগ্রিক শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।
ভূ-রাজনৈতিক ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের এই লাগামহীন রক্তক্ষয়ী সহিংসতার পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে। প্রথমত, মাঠপর্যায়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যাপক ও অবাধ অনুপ্রবেশ এবং এর যথেচ্ছ ব্যবহার। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন-পরবর্তী সময়ে দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বিশেষ করে পুলিশি ব্যবস্থার চরম স্থবিরতা, দুর্বলতা ও এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তা। এবং তৃতীয়ত, ২০২৪ সালের বড় ধরনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় ধরে আত্মগোপনে বা দেশের বাইরে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং দাগি অপরাধীদের হঠাৎ করে পুনরায় প্রকাশ্যে ফিরে আসা।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, গত ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অপরাধ জগতের পুরোনো সমীকরণগুলো ভেঙে নতুন নতুন বলয় তৈরি হয়েছে। আত্মগোপন থেকে ফিরে আসা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা তাদের পুরোনো এলাকা ও অপরাধ সাম্রাজ্য ফিরে পেতে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের একাংশের সাথে আঁতাত করে অবতীর্ণ হয়েছে নতুন রক্তাক্ত খেলায়। এর ফলে বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে প্রকাশ্য রাস্তায় অস্ত্রের মহড়া ও নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সরবরাহ করা সুনির্দিষ্ট মাসিক পরিসংখ্যানের গ্রাফটি বিশ্লেষণ করলে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে অপরাধের এক গভীর সংযোগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নথি অনুযায়ী, এই ৯১৫টি খুনের মামলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৩১৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে গত মার্চ মাসে। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের মতে, এই মার্চ মাসটি ছিল মূলত দেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপির এককভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসার ঠিক পরবর্তী সময়। ক্ষমতা বদলের প্রথম মাসেই দেশজুড়ে দলীয় কোন্দল এবং পুরোনো হিসাব-নিকাশ মেটানোর যে সহিংস রূপ দেখা গিয়েছিল, তা এই ৩১৭টি মার্ডার কেসের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়।
মার্চের এই প্রাথমিক ধাক্কার পর পরবর্তী মাসগুলোতেও অপরাধের এই লাগামহীন গ্রাফ খুব একটা নিচে নামেনি। নথিপত্র অনুযায়ী, পরবর্তী মাস এপ্রিলে দেশব্যাপী ২৮৮টি এবং মে মাসে ৩১০টি খুনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসেই গড়ে প্রায় ৩০০ জনের কাছাকাছি মানুষ রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমান সরকারের নীতি-নির্ধারকেরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করলেও, খোদ পুলিশের নিজস্ব এই পরিসংখ্যানই সরকারের সেই দাবিকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
অবশ্য চলতি বছরের এই ৯ Stamina-বিধ্বংসী পরিসংখ্যানের সাথে গত কয়েক বছরের অপরাধের খতিয়ান মেলালে দেখা যায় যে, বিগত ২০২৫ সালের একই সময়ে (মার্চ-মে) দেশে ৯৯৩টি হত্যাকাণ্ডের মামলা দায়ের করা হয়েছিল। আপাতদৃষ্টিতে গত বছরের চেয়ে চলতি বছরের মামলার সংখ্যা কিছুটা কম মনে হলেও, এর ভেতরে এক বড় ধরনের কৌশলগত পার্থক্য রয়েছে। পুলিশের নথিতে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, ২০২৫ সালের ওই ৯৯৩টি মামলার মধ্যে ২২৬টি ব্যবস্থাপনামূলক মামলাই ছিল মূলত পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা থেকে বিলম্বিত হয়ে আসা মামলা। অর্থাৎ গত বছর তাৎক্ষণিক হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সংখ্যা ছিল বর্তমান বছরের চেয়ে অনেক কম।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মূল বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের একই তিন মাসে দেশব্যাপী দায়ের হওয়া খুনের মামলার মোট সংখ্যা ছিল ৭৯৪টি। ফলে বিগত ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৬ সালের বর্তমান সময়ে এসে দেশে তাৎক্ষণিক ও নতুন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা যে আশঙ্কাজনকভাবে এবং জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, তা এই তুলনামূলক পরিসংখ্যান থেকেই সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে যায়।
পুলিশের ভৌগোলিক ও আঞ্চলিক অপরাধ পরিসংখ্যানের তালিকাটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশের বিভাগ বা রেঞ্জগুলোর মধ্যে হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে বরাবরের মতোই সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও বিপজ্জনক অঞ্চল হিসেবে শীর্ষে অবস্থান করছে ঢাকা রেঞ্জ। ভৌগোলিক বিস্তৃতি এবং জনঘনত্ব বেশি হওয়ার কারণে চলতি বছরের এই নির্দিষ্ট তিন মাসে সর্বাধিক ২০৭টি হত্যাকাণ্ডের মামলা রেকর্ড হয়েছে শুধু ঢাকা রেঞ্জেই।
ঢাকার এই শীর্ষ অবস্থানের ঠিক পরেই অপরাধের মানচিত্রে দ্বিতীয় বিপজ্জনক অঞ্চল হিসেবে উঠে এসেছে বাণিজ্যিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম রেঞ্জ। এই তিন মাসে চট্টগ্রাম রেঞ্জে মোট ১৮৬টি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করেছে পুলিশ। আঞ্চলিক আধিপত্য ও অভ্যন্তরীণ সীমান্ত কেন্দ্রিক চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে এই অঞ্চলে খুনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এছাড়া দেশের পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের চিত্রও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়; এই নির্দিষ্ট সময়ে রাজশাহী রেঞ্জে ১০৬টি এবং শিল্প ও সীমান্তবর্তী খুলনা রেঞ্জে ৮৪টি হত্যাকাণ্ডের মামলা রেকর্ড করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, খুনের এই আঞ্চলিক বিস্তৃতি প্রমাণ করে যে, অপরাধীরা এখন দেশের কোথাও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করছে না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে পুলিশ প্রশাসনকে পুনর্গঠন করা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে দেশজুড়ে বিশেষ যৌথ অভিযান পরিচালনা করা এবং ফিরে আসা শীর্ষ অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি। তা না হলে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা অচিরেই সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে বলে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।