• শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ০৩:৫৯ অপরাহ্ন

কোন পথে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ

Reporter Name / ১ Time View
Update : শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতির সাত দশকের বেশি সময় ধরে কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এখন তার ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন ও অনিশ্চিত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২৩ জুন দলটির ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হলেও এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন ও বর্তমান সরকারের কঠোর আইনি পদক্ষেপে দলটি আজ অস্তিত্বের সংকটে নিপতিত। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়া, শীর্ষ নেতৃত্বের দেশত্যাগ কিংবা কারাবন্দি হওয়া এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীদের দেশব্যাপী আত্মগোপনে থাকা—সব মিলিয়ে দলটি এখন এক নজিরবিহীন বিপর্যস্ত অবস্থায় উপনীত হয়েছে। এই পরিস্থিতি দলটিকে কি চিরতরে বিলুপ্তির পথে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি আড়ালে থেকে তারা কোনো নতুন কৌশলের অপেক্ষায় আছে, তা নিয়ে দেশজুড়ে চলছে তুমুল আলোচনা।

১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এই দলটি দীর্ঘ সময় ধরে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পতাকাবাহী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি জাতীয় অর্জনে দলটির ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দলটি স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রধান কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। দীর্ঘ ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকলেও ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকে দলটি ধারাবাহিকভাবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করে। তবে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকাল দলটির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের বিপরীতে এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূচনা করে। উন্নয়নের মহাসড়ক নির্মাণের চেয়েও বেশি আলোচিত হয়েছে এই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক লুণ্ঠন, অর্থপাচার ও চরম দমন-পীড়ন।

দলটির এই চরম পরিণতির নেপথ্যে রয়েছে গত দেড় দশকের বিতর্কিত শাসন ব্যবস্থা। বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলোতে জনগণের মতামতের তোয়াক্কা না করে একতরফা ক্ষমতা দখল দলটিকে জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। এর পাশাপাশি ব্যাংক খাতসহ অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি এবং সবশেষে জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ওপর চরম সহিংসতা দলটির রাজনৈতিক ও নৈতিক ভিত্তি পুরোপুরি ধসিয়ে দেয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের ঘটনা ছিল সেই পতনের চরম পরিণতি। জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আজ দলটিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে এসেছে যেখানে তাদের প্রকাশ্য রাজনৈতিক অস্তিত্বই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

বর্তমান বাস্তবতায় দলটির শীর্ষ নেতৃত্বে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে। শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের অনেকেই দেশের বাইরে অবস্থান করছেন, যারা ভেতরে ছিলেন তারা কারাগারে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এখন পুলিশি অভিযানের ভয়ে আত্মগোপনে থাকায় সংগঠনের কোনো কার্যকর কাঠামো বা চেইন অব কমান্ড এখন আর অবশিষ্ট নেই। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মতো বড় দিনেও দলের কোনো স্তরে কোনো ধরনের সাংগঠনিক কার্যক্রম চোখে পড়েনি, যা দলটির বর্তমান সাংগঠনিক দুর্বলতারই প্রতিফলন। আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকায় দলটি কোনো ধরনের সভা-সমাবেশ বা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করতে পারছে না। পুলিশের কঠোর নজরদারিতে নেতাকর্মীদের ধরপাকড় চলায় আড়ালে থেকে পুনর্গঠনের চেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, কোনো দল নিষিদ্ধ হলেই তার আদর্শ বা বিশাল সমর্থকগোষ্ঠী মুহূর্তেই হারিয়ে যায় না। ইতিহাস সাক্ষী, অনেক নিষিদ্ধ দলই সময়ের ব্যবধানে আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি থেকে আবার প্রকাশ্যে ফিরে আসার নজির স্থাপন করেছে। তবে আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে এই পথটি অত্যন্ত বন্ধুর। তাদের ফিরে আসার সম্ভাবনা মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, দলটির অভ্যন্তরে ব্যাপক সংস্কার ও আত্মোপলব্ধি। অতীত ভুল, বিশেষ করে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতির জন্য জনগণের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা ছাড়া দলটির জনসমর্থন পুনরায় অর্জন করা অসম্ভব। শেখ হাসিনা-পরবর্তী নতুন ও স্বচ্ছ নেতৃত্বের উত্থান না ঘটলে দলটি জনমনে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবেই।

দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির সমীকরণ। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাব বিবেচনায় রাখলে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দলটি পুনরায় নিজেদের কতটা প্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারে তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। বিশেষ করে বর্তমান সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাদের দূরত্বের যে দেয়াল তৈরি হয়েছে, তা ভাঙা এখন দলটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তৃতীয়ত, বর্তমান সরকারের শাসনকালের দক্ষতা ও পারফরম্যান্স। সাধারণত কোনো সরকার যখন প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক ব্যর্থতায় পড়ে, তখন বিরোধী শক্তি ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়। বিএনপি সরকারের কার্যক্রম কতটা জনবান্ধব হবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কেমন থাকবে—তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতির নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে।

সরকারের ওপর এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতিমাত্রায় দমন-পীড়ন এড়ানো। নেতাকর্মীদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেলে তা বিস্ফোরণোম্মুখ পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে, যা জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ যদি খোলনলচে বদলে ফেলে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক ধারায় নতুন রূপ নিতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে হয়তো তারা রাজনীতির মূলধারায় ফেরার সুযোগ পাবে। তবে সেই পথটি অত্যন্ত দীর্ঘ এবং অনিশ্চিত। আইনি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকাকালীন দলটি আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি পরিস্থিতির চাপে আরও কোনো চরমপন্থার দিকে ধাবিত হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

পরিশেষে বলা যায়, বাঙালির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আওয়ামী লীগ আজ ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সংকটে দাঁড়িয়ে আছে। একনায়কতান্ত্রিক মনোভাব ও ক্ষমতার অহংকার তাদের যে পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কঠোর আত্মশুদ্ধি। কেবল নাম সর্বস্ব রাজনীতির মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়, বরং নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে নতুন নেতৃত্বে দলটিকে পুনরায় সাজাতে হবে। যদি তারা সেই পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়, তবে কালের আবর্তে নিষিদ্ধ দল হিসেবেই তাদের রাজনীতির সমাপ্তি ঘটতে পারে। রাজনীতির মাঠে শেষ কথা বলে কিছু নেই—এই প্রচলিত প্রবাদটির প্রতিফলন হিসেবে আওয়ামী লীগ কি পারবে ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির মতো পুনর্জন্ম নিতে? সেই উত্তর হয়তো সময় এবং দলটির সংস্কার প্রচেষ্টার ওপরই নির্ভর করছে। আজকের এই দিনে দলটি যে ধূলিসাৎ অবস্থায় রয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসা কেবল সময়ের দাবি নয়, এটি দলটির অস্তিত্ব রক্ষার শেষ পরীক্ষা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category