• শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৮ অপরাহ্ন

দুই বছর পর নীতি সুদহার কমাল বাংলাদেশ ব্যাংক

Reporter Name / ২ Time View
Update : শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

বেসরকারি খাতে স্থবির হয়ে পড়া বিনিয়োগে গতি ফেরাতে এবং ঋণের সার্বিক ব্যয় কিছুটা কমিয়ে আনতে দীর্ঘ দুই বছর পর নীতি সুদহার (রেপো রেট) কমানোর এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সুদের হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে নির্ধারণ করে একটি নতুন বার্তা দেওয়া হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য হলো বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তহবিল সংগ্রহ সহজতর করা। উল্লেখ্য যে, বিগত ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে রেপো রেট বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় তা অপরিবর্তিত রাখা হয়। তবে সদ্য ঘোষিত এই শিথিল নীতির মাধ্যমে ব্যাংকগুলো এখন তুলনামূলক কম খরচে তহবিল পাবে, যা পরোক্ষভাবে বেসরকারি উদ্যোক্তা ও গ্রাহকদের জন্য সুদের বোঝা কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ ব্যাংকারেরা।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য গত জুনের শেষে যে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছিল, সেখানে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা হলেও মাত্র এক মাসের ব্যবধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দেশীয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। নীতি সুদহারের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর আপৎকালীন ঋণের সর্বোচ্চ সীমা বা স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ১১ শতাংশে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থ জমা রাখার সর্বনিম্ন সীমা অর্থাৎ স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটির (এসডিএফ) হার সাড়ে সাত শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে এবং নতুন এই হারগুলো আগামী আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকেই কার্যকর করা হবে।

দীর্ঘদিন ধরে কঠোর ও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখার পরও দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতিকে পুরোপুরি কাক্সিক্ষত মাত্রায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি কিছুটা হ্রাস পেয়ে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নামলেও তা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় এখনো বেশ উচ্চপর্যায়ে অবস্থান করছে। মূল্যস্ফীতি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে না আসার পরও সুদের হার কমানোর এই সিদ্ধান্তকে অর্থনীতিবিদরা বেসরকারি খাতের ঐতিহাসিক মন্দা কাটাইয়ের একটি সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। কারণ চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি কমে তলানিতে ঠেকেছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম। ফলে কেবল কঠোর মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি দমানো সহজ হচ্ছে না, বরং এর কারণে নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ পুরোপুরি থমকে গেছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকিং নির্বাহী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানোই বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ফেরানোর জন্য যথেষ্ট নয়, কারণ উদ্যোক্তারা বর্তমানে মারাত্মক জ্বালানি সংকটের সম্মুখীন হচ্ছেন। কারখানাগুলোতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ সুনিশ্চিত করা না গেলে শুধু সহজ শর্তের ঋণ দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি বা নতুন কারখানা স্থাপন করা কঠিন। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস ও জ্বালানি সংকট ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের আত্মবিশ্বাসে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। ব্যাংকে আমানতের উচ্চ সুদের খেসারত হিসেবে সার্বিক ঋণের সুদের হার এখনো চড়া রয়েছে, যার সাথে যুক্ত হয়েছে বিশ্ববাজারে পণ্য রপ্তানি সংক্রান্ত ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা।

রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছুটা স্থিরতা ফিরে আসলেও শিল্প কাঠামোগত দুর্বলতা এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প মালিকরা নতুন মূলধনী বিনিয়োগে সাহস পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারাবাহিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত কয়েক মাসে বেসরকারি ঋণের প্রবাহ ক্রমাগত নিম্নগামী হয়ে সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে ঠেকেছে। এই পটভূমিতে সুদের হার কমানোর উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে ব্যাংকিং খাতে স্বস্তি আনবে, তবে শিল্প উৎপাদন সচল করা ও দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সুসংহত করতে হলে যোগান কাঠামোর ঘাটতি দূর করা অত্যন্ত জরুরি। আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার টেকসই সমাধান করা না গেলে কেবল রেপো রেট কমিয়ে বেসরকারি খাতের ঋণের খরা কাটানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থেকে যাবে।

তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category