• শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৯ অপরাহ্ন

১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়ন: থমকে আছে উন্নয়ন প্রকল্প

Reporter Name / ২ Time View
Update : শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এবং দুই দফায় নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করা সত্ত্বেও দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ইতিবাচক কোনো গতি আনা সম্ভব হয়নি। উল্টো বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের সামগ্রিক হার নেমে এসেছে গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) চূড়ান্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, বিদায়ী অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির মোট বরাদ্দের বিপরীতে বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশে। এটি দেশের ইতিহাসে টানা দ্বিতীয়বারের মতো এডিপি বাস্তবায়নের গতি ৭০ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার ঘটনা, যা বৈশ্বিক মহামারী করোনা কাল কিংবা সাম্প্রতিক সময়ের বড় বড় রাজনৈতিক আন্দোলনের সময়ের অর্জনকেও ছাড়িয়ে অর্থনৈতিক স্থবিরতার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের এই অভূতপূর্ব শ্লথগতির পেছনে বড় বড় প্রকল্পের কেনাকাটা বা ক্রয়প্রক্রিয়ায় দেখা দেওয়া দীর্ঘসূত্রতা, জমি অধিগ্রহণের পুরোনো জটিলতা, বৈদেশিক অর্থ ছাড়ে ধীরগতি এবং প্রশাসনে উপর্যুপরি পরিবর্তনজনিত সিদ্ধান্তহীনতাই মূলত প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবেশ সংরক্ষণের মতো স্পর্শকাতর এবং জনগুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে অর্থ ব্যয়ের চরম অক্ষমতা দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির আওতায় মোট দুই লাখ আট হাজার ৯৩৫ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হলেও বছর শেষে বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো খরচ করতে পেরেছে মাত্র এক লাখ ৪১ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের ক্ষেত্রে ৬৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে ৬৯ দশমিক ২০ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে।

খাতওয়ারি তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে হতাশাজনক পারফরম্যান্স দেখিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়গুলো। বিদায়ী অর্থবছরে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ, স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগে ৩৬ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ঝুলিতে জমা পড়েছে মাত্র ৩২ দশমিক ৪৫ শতাংশ বাস্তবায়নের রেকর্ড। করোনা প্রাদুর্ভাবের চূড়ান্ত মুহূর্তে কিংবা লকডাউনের কড়া বিধিনিষেধের সময়েও যেখানে দেশে এডিপি বাস্তবায়নের হার ৮০ থেকে ৯২ শতাংশের আশপাশে ধরে রাখা সম্ভব হয়েছিল, সেখানে গত দুই অর্থবছরের (২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬) রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও অস্থিরতায় এই হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যথাক্রমে ৬৮ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশে নেমে এসেছে।

তবে পুরো এডিপির সার্বিক চিত্রে শ্লথগতি থাকলেও সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া কয়েকটি নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় তুলনামূলক ভালো দক্ষতা দেখাতে পেরেছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ তাদের বরাদ্দের ৯৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় করে তালিকার শীর্ষে রয়েছে। এছাড়া পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয় ৮৭ থেকে ৮৮ শতাংশের বেশি অর্থ ছাড় ও প্রয়োগ করতে সমর্থ হয়েছে। বিদ্যুত ও বিজ্ঞান প্রযুক্তি খাতও ৮০ শতাংশের বেশি এডিপি বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু অন্যদিকে শিক্ষা খাতের তিনটি প্রধান বিভাগ—মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ—৫০ থেকে ৬৬ শতাংশের ঘরে আটকে থাকায় সার্বিক এডিপির পারফরম্যান্স মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, পর্যাপ্ত বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের সহজলভ্যতা থাকা সত্ত্বেও তার ৩০ শতাংশ অর্থও খরচ করতে পারেনি বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর। এই ব্যর্থতার তালিকায় রয়েছে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মতো নীতি নির্ধারণী বিভাগগুলো। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদেশিক ঋণের সঠিক ব্যবহার না হওয়া এবং এডিপি বাস্তবায়নের এই টানা মন্দা দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নকে পিছিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সার্বিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে গতি ফেরাতে হলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে প্রকল্প পরিচালকদের প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category