• বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:০৯ অপরাহ্ন

পররাষ্ট্রনীতিতে সূক্ষ্ম ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ: ওয়াশিংটন-দিল্লি-বেইজিংয়ের নজর ঢাকায়

Reporter Name / ৪ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের পর দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক দৃশ্যপটে এক বৈপ্লবিক মোড় পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিন বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত দূত সার্জিও গোরের ঢাকা সফর, ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সাথে তাঁর বৈঠক এবং একই সময়ে ভারতের সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান ব্যাখ্যা—এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। তবে নিছক কাকতালীয় সময়ের মিল দেখে কোনো আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্তে না পৌঁছে গভীর বিশ্লেষণের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশ বর্তমানে তিনটি প্রধান পরাশক্তি—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং চীনের মধ্যকার এক সূক্ষ্ম ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।

ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি স্পষ্ট করেছে যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কেবল মানবিক ও সাময়িক আশ্রয়ে রাখা হলেও ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। একই সাথে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রেরিত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত অনুরোধপত্রটি যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক কাঠামোর মধ্যে রেখে গভীরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে। ভারতের এই অবস্থান মূলত তাদের দীর্ঘদিনের ঘোষিত নীতিরই অংশ—যেখানে প্রতিবেশীদের নিরাপত্তার ক্ষতি করে নিজেদের মাটি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের বিশাল বাণিজ্যিক বাজার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখতেই দিল্লি কিছুটা পরিমিত ও অহস্তক্ষেপ নীতি গ্রহণ করছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শেখ হাসিনার পুনর্বাসনের আশা যখন ক্ষীণ হয়ে আসছে, তখন ভারত নিজেদের আঞ্চলিক স্বার্থ সুরক্ষায় বাস্তবমুখী কৌশল গ্রহণ করছে। অতীতে ১৯৯৭ সালে পাহাড়ি বিদ্রোহী নেতা বা কাদের সিদ্দিকীর ক্ষেত্রে যে ধরনের কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জাতীয় স্বার্থের তাগিদে ভারত তার পুনর্বিবেচনা করতে পারে। ভারতের আশঙ্কা ছিল, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সক্রিয় উপস্থিতি থাকলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সম্পূর্ণরূপে ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। তাই ড. ইউনূসের অনুপস্থিতিতে বা স্বাধীন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠনকেই নয়াদিল্লি দীর্ঘমেয়াদে বেশি সুবিধাজনক বলে মনে করছে। সম্পর্কের ওপর জমা বরফ গলাতে বাংলাদেশ ব্রিকসের পূর্ণাঙ্গ সদস্য বা পর্যবেক্ষক না হওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের সুনির্দিষ্ট ও বিশেষ আমন্ত্রণ পাঠিয়েছে নয়াদিল্লি।

তবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বরফ গলানোর প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ভারতীয় সাবেক কূটনীতিকদের কিছু আগ্রাসী ও শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্য নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। ভারতে নিযুক্ত সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রির সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিষ্টাচারের পরিপন্থী হিসেবে দেখছে সচেতন মহল। তিনি দাবি করেছেন যে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার রাজনৈতিক অভ্যুত্থান নাকি কেবল একটি সাধারণ বিপ্লব ছিল না; বরং তা ছিল পশ্চিমা শক্তির ছায়ায় চালিত এক গভীর রাজনৈতিক অপারেশন। একই সাথে, তিনি অভিযোগ করেছেন যে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের আড়ালে ‘ইসলামীকরণ’ ও ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে এবং বাংলাদেশ তার প্রতিরক্ষা কাঠামোর ভেতরে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ বা যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ভারতের ‘নিরাপত্তা সংক্রান্ত রেড লাইন’ লঙ্ঘন করা হচ্ছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করলেও, তিস্তা নদী প্রকল্প বা মোংলা বন্দর উন্নয়নে চীনের উপস্থিতি নিয়ে ভারতের বছরের পর বছর ধরে চলা অনীহা ও সময়ক্ষেপণ নিয়ে তিনি কোনো আলোকপাত করেননি।

অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গিতে এসেছে বিরাট এক কৌশলগত রূপান্তর। যুক্তরাষ্ট্র এখন আর বাংলাদেশকে শুধু দিল্লির চোখে দেখতে রাজি নয়; তারা ঢাকাকে সরাসরি এক স্বাধীন কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। এর পেছনে প্রথমত যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত অবস্থান, দ্বিতীয়ত বঙ্গোপসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব ঠেকানো এবং তৃতীয়ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাজার ও প্রযুক্তি খাতে সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গর ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে ভ্রমণ সতর্কতা (ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি) লেভেল ৩ থেকে লেভেল ২-এ নামিয়ে আনা হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে সরাসরি অর্থলগ্নি করার ইতিবাচক সংকেত পাঠায়।

পরাশক্তিগুলোর এই বহুমুখী প্রতিযোগিতার মাঝে বাংলাদেশ যে হেজিং বা ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি গ্রহণ করেছে, তার প্রমাণ মেলে অত্যন্ত কৌশলী কিছু পদক্ষেপে। মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গর বাংলাদেশকে তাঁদের উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক ও সেমিকন্ডাক্টর জোট ‘প্যাক্স সিলিকা’-তে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই দিনে চীন চালিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক ফ্রন্ট ‘ওয়াইকো’-তে বাংলাদেশ পর্যবেক্ষক দেশ হিসেবে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। ওয়াশিংটন কিংবা বেইজিং—কোনো একক বলয়ের কাছে নিজেদের সার্বভৌমত্ব বন্ধক না দিয়ে বাংলাদেশ যে ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়ার মতো স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আগাতে চাইছে, এই পদক্ষেপ তারই প্রমাণ বহন করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও আমেরিকার সাথে কৃষিপণ্য, যেমন—সয়াবিন, তুলা ও গম সংরক্ষণাগার এবং প্রযুক্তি খাতে বড় অঙ্কের মার্কিন বিনিয়োগ আহ্বান করেছেন, কিন্তু সামরিক ব্লকে ঢোকার বিষয়ে কোনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেননি।

সব মিলিয়ে, বর্তমান কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এক কৌশলগত ও স্পর্শকাতর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল একক রপ্তানি বাজার ও নতুন বিনিয়োগ সুবিধা, অন্যদিকে চীনের মেগা অবকাঠামো উন্নয়ন সহায়তা এবং প্রতিবেশী ভারতের সাথে ঐতিহাসিক নিরাপত্তা, সংযোগ ও বিদ্যুৎ বাণিজ্য—এই তিন অক্ষের সাথে সমান দূরত্ব বজায় রেখে চলা বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের মূল পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক গৌতম দাসসহ অনেকের মতে, বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার যদি আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর চাপ এড়িয়ে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে সর্বাদ্রে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, তবে সার্বভৌম diplomatic অবস্থান সুসংহত করা সম্ভব হবে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মতো পরাশক্তিগুলো সবসময় নিজেদের বৈশ্বিক স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেবে; কিন্তু বাংলাদেশ যদি নিজস্ব ভৌগোলিক গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে নিরপেক্ষতা ও দূরদর্শিতার সাথে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় উদীয়মান এক শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান স্থায়ী করতে সমর্থ হবে।

তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category