কৃষি খাতে প্রদত্ত রাষ্ট্রীয় ঋণ, ভর্তুকি এবং সরকারি প্রণোদনার বিতরণব্যবস্থা স্বচ্ছ ও সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী শুরু হওয়া ‘কৃষক কার্ড’ নিবন্ধন কার্যক্রম শুরুতেই নানা প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত বাধার মুখে পড়ে ধীরগতির শিকার হয়েছে। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর চলতি আগস্ট মাসের মধ্যে ১০ লাখ এবং পুরো বছরে ৪৭ লাখ কৃষককে এই কার্ডের আওতায় নিয়ে আসার সুউচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। মূলত প্রয়োজনীয় অর্থছাড়ে দীর্ঘসূত্রতা, ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থা না থাকা এবং চাহিদা অনুযায়ী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ইন্টারন্যাশনাল ডেবিট কার্ড সরবরাহে চরম অক্ষমতা—এই তিন প্রধান সংকটের কারণে থমকে গেছে পুরো উদ্যোগের গতি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং অবকাঠামোগত ঘাটতির কারণে নির্ধারিত সময়ে সেবা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলমান ‘প্রোগ্রাম অন অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ বা ‘পার্টনার’ প্রকল্পের মাধ্যমেই মূলত দেশজুড়ে এই কৃষক কার্ড প্রদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (ইফাদ) এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে ২০২৩ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মূল ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) কার্ড ব্যবস্থার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল মাত্র ৭৪১ কোটি টাকা। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরবর্তীতে সরকারের বিশেষ অগ্রাধিকার যুক্ত হওয়ার পর দেখা যায়, সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ২ কোটি ২৭ লাখ কৃষকের জন্য এই বরাদ্দ অপ্রতুল। পরবর্তী সময়ে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, রামু অ্যাগ্রো ইকোপার্ক কিংবা প্ল্যান্ট কোয়ারেন্টাইন ল্যাবরেটরির মতো কম গুরুত্বপূর্ণ খাতের বরাদ্দ ছাঁটাই করে কৃষক কার্ডের বাজেট বাড়িয়ে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়। এমনকি গতি বাড়াতে সরকারের রাজস্ব খাত থেকেও সমপরিমাণ অর্থের বিশেষ বরাদ্দের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৃথক প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রস্তুতকৃত তথ্য বলছে, ইতোমধ্যে দেশের ৫০৩টি উপজেলার নির্দিষ্ট কিছু ব্লকে তথ্য সংগ্রহের পাইলোটিং শেষ হয়েছে এবং সব মিলিয়ে শনিবার পর্যন্ত ১১ লাখ ৪১ হাজার ৩২৪ জন কৃষক নিবন্ধিত হয়েছেন। একই সাথে আটটি বিভাগের বাছাইকৃত ১০টি জেলার ১১টি ব্লকে বিশ হাজারেরও বেশি কৃষকের হাতে প্র পরীক্ষামূলকভাবে কার্ড হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড তথ্যভান্ডার না থাকায় নিবন্ধনের ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে মারাত্মক তথ্যগত অসংগতি। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বে নিয়োজিত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের সম্পূর্ণভাবে কৃষকদের দেওয়া মৌখিক তথ্যের ওপর ভরসা করতে হচ্ছে। ফলে কে প্রকৃত কৃষক বা কার জমির পরিমাণ কতটুকু, তা যাচাই করার মতো কোনো স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল ব্যবস্থা না থাকায় কার্ডে অনেক ভুল ও ভুয়া তথ্য যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
পরিকল্পনার দ্বিতীয় বড় ধাক্কাটি এসেছে অর্থ লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে নির্ধারিত ইন্টারন্যাশনাল ডেবিট কার্ডের সংকট থেকে। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষকদের হাতে ব্যাংকিং কার্ড তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও ব্যাংকগুলো সরাসরি তাদের সীমিত সক্ষমতার কথা জানিয়ে দিয়েছে। যেখানে সরকার আগস্টেই ১০ লাখ কার্ড বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেখানে সংশ্লিষ্ট তিনটি ব্যাংক যৌথভাবে জানিয়েছে যে আগামী তিন মাসে তারা সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার কার্ড প্রসেস বা ইস্যু করতে পারবে। ফলে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার সরবরাহের বিশাল ব্যবধান প্রকল্পটির ভবিষ্যৎকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। কেবল তাই নয়, দেশের উপকূলীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন উপজেলায় কর্মরত কর্মীরা কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ, বিশেষ ভাতা বা দাপ্তরিক ডিজিটাল ডিভাইস না পেয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে বাধ্য হয়ে তথ্য আপলোড করছেন, যাতে অ্যাপ জনিত নানা প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
সংকট মোকাবিলায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দ্রুত বাজেট অনুমোদন এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাজের ন্যূনতম সুবিধাদি নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের উর্ধতন কর্মকর্তারা দাবি করছেন, সাময়িক এই তিন সংকট কেটে গেলে মৎস্যচাষি ও দুগ্ধ খামারিদেরও ক্রমান্বয়ে এই সার্বজনীন কৃষক কার্ডের আওতায় যুক্ত করা যাবে। কিন্তু বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও আর্থিক বরাদ্দের ধীরগতি না কমলে কেবল বাজেট বাড়িয়ে শতভাগ কৃষককে ডিজিটাল তথ্যভান্ডারে নিয়ে আসা অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন খাতের বিশেষজ্ঞরা।