২০১২ সাল।
অতি রূপবতী মেলিন্দাই আমাকে বাঘের গুহায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল!
OECD-এর কর সংক্রান্ত বার্ষিক সম্মেলন হচ্ছে। ১১৩টি দেশের লোকজন এসেছে। আমিও গিয়েছি। আমার তুলনায় অন্য দেশের ডেলিগেটরা অনেক অভিজ্ঞ ও সিনিয়র। নিজেকে বাঘের পালে মেষশাবক মনে হচ্ছে।
মেলিন্দা এসেছে উরুগুয়ে থেকে। প্রথম দিন থেকেই তার চারপাশে রূপমুগ্ধ ভক্তদের ভিড়। সবাইকে বাদ দিয়ে সে আমাকেই কেন খাতির করা শুরু করল জানি না। সম্ভবত আমার গোবেচারা ভাব দেখে ভেবেছে সাময়িক বডিগার্ড হিসেবে এ নাবালক টাইপ মেষের বাচ্চাকে বেছে নেওয়াই ভালো।
সেমিনারের প্রথম দিনে বিশেষ অতিথি হিসেবে কথা বললেন, জাতিসংঘের একজন ডিরেক্টর। নাম আলেক্সান্ডার ট্রিপলকভ।
তিনি বললেন যা বললেন, তা হলো-জাতিসংঘ ইন্টারন্যাশনাল ট্যাক্স নিয়ে কাজ করার জন্য একটা টিম করবে। মূলত বিশ্বের নামকরা তেরজন বিশেষজ্ঞ এতে কাজ করবেন। তাঁদের সাহায্য করার তেরজন খণ্ডকালীন সহকারী নেওয়া হবে। এ উদ্দেশ্যে পরদিন OECD ক্যাফেতে ওয়াক-ইন ইন্টারভিউ নেওয়া হবে। আগ্রহীরা চাইলে সে ইন্টারভিউতে যোগ দিতে পারে।
তারপর তিনি সবাইকে একটি ধারণাপত্র দিলেন, যাতে প্রস্তাবিত কমিটি কী ধরনের কাজ করবে তা বলা হয়েছে।
লাঞ্চ ব্রেকে কফি নিয়ে বসেছি। এমন সময় মেলিন্দা বলল, ‘তুমি জাতিসংঘের ইন্টারভিউ দেবে?’
আমি খুব বিস্মিত হয়ে বললাম, ‘বলো কী? ওরা যে বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করতে যাচ্ছে আমি তার তেমন কিছুই জানি না। তাছাড়া, এ বিষয়ে পণ্ডিত কত লোকজন ইন্টারভিউ দেবেন।’
মেলিন্দা হাত নেড়ে বলল, ‘বোকা’।
আমি আরো অবাক হয়ে বললাম, ‘কে বোকা?’
সে কফির কাপে ছোট্ট চুমুক দিয়ে বলল ‘ইউ ফুল। তুমি বোকা।’
আমি কিছুটা রাগ নিয়ে বললাম, ‘কেন বোকা?’
‘কারণ তুমি বুঝতে পারোনি, ওরা স্পেশালিস্ট খুঁজছে না। তেরজন স্পেশালিস্ট অলরেডি নিয়ে নিয়েছে। এখন নেবে তাদের সাহায্যকারী। তুমি তো আর জাতিসংঘের মহাসচিবকে রিপ্লেস করার জন্য ইন্টারভিউ দিচ্ছ না। গবেষণা সহকারীর ইন্টারভিউ দিচ্ছ। এ পদে ওরা পণ্ডিত নেবে না। কমবয়সী মেধাবী লোকজন নেবে, যারা খাটতে পারবে। তুমি ইন্টারভিউ দাও। দেয়ার ইজ আ গুড চান্স।’
আমি ওর কথায় সায় না দিয়ে বললাম,
‘যা-ই বলো, আমি ইন্টারভিউতে দেবো না। ওদের কঠিন কঠিন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো পড়াশোনা আমার নেই।’
‘আরে দিয়েই দেখো না। আজকের প্রোগ্রাম শেষে সন্ধ্যায় দুজনে বসে বিষয়গুলো ঝালাই করে নেব। দেখবে, সমস্যা হবে না।’
‘ঝালাই করে তুমি ইন্টারভিউ দাও। আমি দেবো না।’ আমি বললাম।
‘ইউ ফুল! ঝালাই করতে বসব তোমার জন্য। আমার জন্য না। আমি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস-এ পড়তে যাচ্ছি। তারপর এ চাকরি ছেড়ে কর্পোরেটে ঢুকব।’ এখন মেলিন্দার কণ্ঠে ঝাঁজ।
শেষ পর্যন্ত তার জ্বালায় ইন্টারভিউ দিলাম।
টিকেও গেলাম!
২০১৩ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত আমি সে কমিটিতে খণ্ডকালীন কাজ করেছি। এটি আমার কর্মজীবনের এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
২ ) ২০১৪ সাল।
জাতিসংঘের কমিটিতে কাজ করার সুবাদেই মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আরভিং দিয়াংয়ের সঙ্গে আমার পরিচয়।
জাতিসংঘের জন্য তিনি একটি গবেষণাপত্র লিখবেন। আমি তাঁর সহ-লেখক। কাজটি দিয়াংয়ের সাথে প্যারিসে বসে করতে হবে।
আগেই শুনেছিলাম, বাঘিনীর খপ্পরে পড়তে যাচ্ছি। আমার লিশ্টেনস্টাইনের বন্ধু স্তেপিয়ান তাঁর সঙ্গে আগে কাজ করেছে। সে যা বলল তার মর্মার্থ হচ্ছে-‘দোস্ত, ঝিম মেরে পড়তে বসে যা, নয়ত অন্য কোনো উসিলায় কাট মার। নইলে বেইজ্জতির সীমা থাকবে না। মহিলা ভয়ংকর।’
এ রকম মারাত্মক সাবধানবাণীর পরও আমার যে কারণে কাট মারা হলো না তা হচ্ছে, জাতিসংঘের টাকায় স্ত্রী-কন্যাসহ ইউরোপ বেড়াবার সুযোগ। তারা যে পয়সা দেবে তাতে সবার খরচ কুলিয়ে আরো থাকবে।
মধ্যবিত্তের টিপিক্যাল আচরণ আর কী!
দিয়াংয়ের সাথে কাজ শুরু করার এক ঘণ্টার মধ্যে তিনি যা বললেন, তা হচ্ছে, ‘আমি ভাবতেও পারছি না, তোমার মতো ছাগলকে আমার সাথে জুড়ে দেওয়া হলো কেন?’
যে কদিন কাজ করলাম, বুঝলাম ছাগল তাঁর খুব প্রিয় প্রাণী। এই অবোধ প্রাণীর নাম বলতে বলতে মোটামুটি তিনি আমাকে বিশ্বাস করিয়ে ছাড়লেন যে, আমি আসলেই একটি রামছাগল।
গবেষণাপত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপনের পর মন খারাপ করে দেশে ফিরে এলাম। আরভিংয়ের ব্যবহার মন খারাপের কারণ।
কয়েক মাস পর পানামা সরকার সে দেশে তিন সদস্যের একটি টিম পাঠানোর জন্য জাতিসংঘকে অনুরোধ করল। এদের কাজ হবে পানামার অফিসারদের আন্তর্জাতিক কর চুক্তি বিষয়ে ট্রেনিং দেওয়া।
অবাক হয়ে দেখলাম, জাতিসংঘের
সেই টিমে আমার নাম! দলনেতা আরভিং দিয়াং। আমি অতি বিস্মিত। ছাগল হিসেবে খ্যাতি পাওয়া আমাকে এ দলে রাখা হলো কেন?
যাই হোক, পানামা পৌঁছালাম।
প্রথমেই ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটরকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার নামটা এখানে কীভাবে ঢুকল?’
তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘আরভিং দিয়াং সোজাসাপ্টা বলেছে, তোমাকে টিমে না নিলে সে পানামা আসার খ্যাতা পুড়ে। ইন্টারন্যাশনাল ট্যাক্স নাকি তুমি খুব ভালো বুঝো।’
আমাকে বকাঝকা করাটা যে এই দজ্জাল ভদ্রমহিলার স্নেহের প্রকাশ ছিল তা আমি এর আগে ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি!
৩ ) আমার বাসায় একটি পেইন্টিং আছে। সেটির শিরোনাম ‘গডেস ডিসেন্ডিং ফ্রম দ্য স্কাই’- ‘আকাশ থেকে দেবী নামছে।’
ছবিটা দেখলেই আমার মেলিন্দা এবং আরভিংয়ের কথা মনে হয়।
তাঁরা দুজন যেন আকাশ থেকেই আমাকে সাহায্য করার জন্য নেমে এসেছিলেন।
#আসুন মায়া ছড়াই