• রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৫৭ অপরাহ্ন
Headline
অ্যাঞ্জেল মেরি কামস টু মি (দ্বিতীয় পর্ব) স্নাতকোত্তর পর্যন্ত নারীদের পড়ালেখা ফ্রি করবে সরকার: ডা. জুবাইদা ইলিয়াস আলী গুম: বিমান বাহিনীর উইং কমান্ডার সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বিভ্রান্তকারীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন : প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের জন্য বিএনপির দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ সালমান শাহ হত্যা মামলা: ডনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ বাঁশখালীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে ঘরের চাবি তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন প্রধানমন্ত্রীর হেফাজতের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ দ্রুত অস্ত্র উৎপাদনে ২১ দিনের সময় দিল পেন্টাগন

চড়া দামে ফার্মেসিই ভরসা: জরুরি ৭৮% ওষুধ নেই সরকারি হাসপাতালে

Reporter Name / ১ Time View
Update : রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার আশায় প্রতিদিন হাজার হাজার প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত মানুষ ভিড় করলেও কাঙ্ক্ষিত ওষুধের দেখা মিলছে না। চাহিদার বিপরীতে হাসপাতালগুলোতে সরকারি ওষুধের মিলছে গড়ে মাত্র ২২ শতাংশ, যার অর্থ দাঁড়ায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের প্রয়োজনের প্রায় ৭৮ শতাংশ ওষুধই চড়া দামে বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের অর্থায়নে ও পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) পরিচালিত এক সাম্প্রতিক যৌথ গবেষণায় এই করুণ চিত্র ভেসে উঠেছে। দেশের আটটি বিভাগের ২২টি সরকারি হাসপাতালে ৯ মাস ধরে মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা ও নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, সাধারণ রোগী তো বটেই, এমনকি জটিল রোগে আক্রান্তদেরও বেশিরভাগ প্রয়োজনীয় ওষুধ চিকিৎসকের কাউন্টার থেকে পাওয়ার কোনো উপায় নেই। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই প্রশাসনিক স্থবিরতা দেশের কোটি কোটি পরিবারকে নতুন করে চরম দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে।
গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তৃণমূলের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর চেয়ে বড় বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে এই সংকট সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ। মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় সরকারি ওষুধের মজুদ রয়েছে চাহিদার মাত্র ১২ শতাংশ। অন্যদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৩ শতাংশ এবং জেলা হাসপাতালগুলোতে মাত্র ২৪ শতাংশ ওষুধের যোগান পাওয়া যাচ্ছে। সংকট কেবল ওষুধেই সীমাবদ্ধ নয়, হাসপাতালগুলোতে থাকা জরুরি রোগ নির্ণয় বা ডায়াগনস্টিক যন্ত্রপাতির প্রায় ৫২ শতাংশ যন্ত্রই অব্যবহৃত বা অকার্যকর অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে দেশের জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে সেবা নিতে আসা রোগীদের সাধারণ গ্যাস্ট্রিক, প্যারাসিটামল কিংবা অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় দু-একটি সাধারণ ট্যাবলেট দিয়ে বিদায় করা হচ্ছে, অন্যদিকে হৃদরোগ, তীব্র সংক্রমণ কিংবা জটিল ব্যাধির চড়া মূল্যের ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বাধ্য হয়ে পাঠাল হচ্ছে বাইরের প্রাইভেট ক্লিনিকে।
মাঠপর্যায়ের সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকার পার্শ্ববর্তী ধামরাই উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গত এক বছর ধরে কোনো ধরনের সরকারি ওষুধ সরবরাহ করা হয়নি। ওষুধ না থাকায় প্রসূতি সেবা, নরমাল ডেলিভারি এবং বয়োসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য পরামর্শ কার্যক্রম সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ, লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ, মেহেরপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল কিংবা পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বহু রোগী দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসকের পরামর্শপত্র হাতে পাওয়ার পরও বিনা ওষুধে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরছেন। কোনো কোনো জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ রোগীর চাপ থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে বরাদ্দ সেই অনুপাতে বাড়ানো হয়নি। তবে সংকটের পেছনে কেবল বাজেট ঘাটতিই একমাত্র কারণ নয়; বরং বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সদ্য সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনের সময় পরিত্যক্ত ভবনে ও বাথরুমে লাখ লাখ টাকার মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী পড়ে থাকার ঘটনা প্রমাণ করে যে, সংকটটি বরাদ্দের চেয়ে বেশি তদারকি ও ব্যবস্থাপনার।
বিনামূল্যের চিকিৎসায় নিজেদের পকেটের টাকা ঢালতে গিয়ে দেশের সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর কেমন মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসছে, তা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তথ্য থেকে পরিষ্কার হয়। বিআইডিএসের তথ্যমতে, স্বাস্থ্যসেবার অসংগতি ও অতিরিক্ত খরচ মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর দেশের প্রায় ৬১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩.৭ শতাংশ। এ ছাড়া চিকিৎসা খরচের যোগান দিতে দেশের ৫৮ শতাংশ মানুষ চড়া সুদে ধারদেনা করছে, জমা জমি বিক্রি করছে কিংবা জীবনের শেষ সম্বল বা সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছে। শুধু খরচের যোগান দিতে না পেরে দেশের প্রায় তিন কোটি মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নেওয়া থেকেই নিজেদের সম্পূর্ণ গুটিয়ে রাখছে। ‘জাতীয় স্বাস্থ্য অর্থনীতি’র তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ অর্থই রোগী নিজের পকেট থেকে খরচ করে, যার সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৬৪.৬ শতাংশ চলে যায় কেবল ওষুধ কেনার পেছনে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের গবেষকরা সতর্ক করে বলছেন যে, সরকারি হাসপাতালে এসে চিকিৎসক দেখালেও চড়া দামে ওষুধ বা ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা বাইরের দোকান থেকে করানোর এই ‘অলিখিত নিয়ম’ মূলত পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গভীর কঙ্কালসার রূপকেই উন্মোচিত করে। চিকিৎসা ব্যয়ের এই ক্যাটাস্ট্রফিক বা বিপর্যয়কর খরচের বোঝা বহন করতে গিয়ে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে সন্তানের শিক্ষা ও পুষ্টির বাজেট কাটছাঁট করছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামাজিক বিকাশকে ব্যাহত করছে। এই দুষ্টচক্র থেকে বের হতে হলে কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়; বরং ডিজিটাল ই-প্রেসক্রিপশন, রিয়েল-টাইম অডিট, ওষুধ সরবরাহে স্বচ্ছতা আনা এবং চিকিৎসকদের বার্ষিক ব্যবস্থাপত্র বিশ্লেষণ করে প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে ওষুধ কেনার বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারি হাসপাতালের কাউন্টার থেকেই রোগীকে সব ধরণের সরকারি ওষুধ শতভাগ বিনামূল্যে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা না গেলে বিনামূল্যে চিকিৎসার সরকারি প্রতিশ্রুতি কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category