• সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:১০ অপরাহ্ন

মেগা প্রকল্পের ব্যর্থতা ও মহাবিপর্যয়ে জাতীয় গ্রিড: আবারও লাগামহীন লোডশেডিং

Reporter Name / ২ Time View
Update : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬

দেশজুড়ে তাপদাহ বৃদ্ধি ও সাম্প্রতিক বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেলেও উৎপাদনের চরম সংকটে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর এক অভূতপূর্ব অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে গ্যাস সরবরাহের চরম ঘাটতি এবং কয়লা খালাস কার্যক্রমে অব্যাহত বিঘ্ন, অন্যদিকে ভারতের সাথে যৌথ মালিকানাধীন ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের রামপাল থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্টের অবিরাম যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দেশজুড়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) হালনাগাদ তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেখানে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় লোডশেডিংয়ের মাত্রা ছিল মাত্র কয়েকশ মেগাওয়াট, সেখানে মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে সেই ঘাটি ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার এই চরম নড়বড়ে চিত্র পুরো দেশের কৃষি, শিল্প খাত এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
জাতীয় গ্রিডের এই চরম বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের প্রধানতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে জ্বালানি খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা। কক্সবাজারের এক্সিলরেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের যান্ত্রিক গোলযোগ কিছুটা মেরামত করে জাতীয় লাইনে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বৃদ্ধি করে দৈনিক ২,৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত করা হলেও, বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো তার সুফল পাচ্ছে না। পূর্বে যেখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো দৈনিক প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেত, সেখানে সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পর সরবরাহ নেমে এসেছিল ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে এবং বর্তমানে তা সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৮০ মিলিয়ন ঘনফুটে। দেশের গৃহস্থালি, শিল্পকারখানা ও সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে অতিরিক্ত গ্যাস পুনর্বণ্টন করার কারণে কম খরচের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিপুল সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পিডিবি সেগুলোকে পুরোপুরি চালু রাখতে পারছে না। ফলে স্বাভাবিক সময়ে গড়ে ৩৫০০ থেকে ৩৯০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করা এই কম খরচের কেন্দ্রগুলো এখন চাহিদার এক-তৃতীয়াংশও মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে।
গ্যাস সংকটের বিকল্প হিসেবে যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভর করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, বৈরী আবহাওয়া ও সমুদ্রের উত্তাল পরিস্থিতির কারণে কয়লা খালাস কার্যক্রমে তৈরি হওয়া জটিলতায় সেই খাতও মুখ থুবড়ে পড়েছে। চট্টগ্রাম, পায়রা ও ভারতের আদানি থেকে আসা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বড় মাদার ভেসেল থেকে লাইটার জাহাজে কয়লা নামানো ও পরিবহন প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় বেশ কিছু প্ল্যান্টের উৎপাদন হঠাৎ করেই কমে যায়। উদাহরণস্বরূপ, গত ৮ আগস্ট দুপুর ২টায় যেখানে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো ৫,১৯৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল, সেখানে বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে কয়লা হ্যান্ডলিং জটিলতার কারণে একলাফে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৪,৭৩৪ মেগাওয়াটে। এর পাশাপাশি পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৬৬০ মেগাওয়াটের ১ নম্বর ইউনিটটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের বিশাল ঘাটতি দেখা দেয়, যা নতুন করে সিঙ্ক্রোনাইজ করা সত্ত্বেও স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে লম্বা সময় পার করছে।
গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক স্বল্পব্যয়ী উৎপাদন ব্যবস্থা যখন একযোগে ব্যর্থ হয়, তখন রাষ্ট্রীয় সংস্থা পিডিবি বাধ্য হয়ে ঝুঁকছে অতিরিক্ত ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েল বা ভারী জ্বালানি তেল (এইচএফও) চালিত প্রাইভেট বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর দিকে। পিজিসিবির হিসাব অনুযায়ী, স্বল্পমূল্যের গ্যাসে যেখানে দৈনিক ৩০ থেকে ৩৩ কোটি টাকা খরচে গড়ে ৩৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব, সেখানে এইচএফও চালিত কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতিদিন সরকারের গচ্চা যাচ্ছে ৯০ কোটি টাকারও বেশি। কেবল গত ৮ আগস্ট সন্ধ্যায় পিক আওয়ারে ৩,১০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ তৈরি করতে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালাতে গিয়ে পিডিবির কোষাগার খালি হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অথচ পিডিবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ প্রায় ১৪ টাকার বেশি দামে উৎপাদন ও সংগ্রহ করে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করছে মাত্র ১১ টাকায়, যার ফলে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতি ও ভর্তুকির বোঝা চেপে বসছে জনগণের কাঁধে।
জ্বালানি খাতের সার্বিক এই অব্যবস্থাপনা ও দৈন্যদশাকে চরমমাত্রায় প্রতিফলিত করছে বিআইএফপিসিএল পরিচালিত ভারত-বাংলাদেশ যৌথ মালিকানাধীন মেগা প্রকল্প রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ভারতের এক্সিম ব্যাংকের ১৬০ কোটি ডলার (প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা) ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে নির্মিত ১৩২০ মেগাওয়াটের এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি এখন চালুর মাত্র তিন বছরের মাথায় এক ভয়াবহ ‘বন্ধের খেলায়’ মেতে উঠেছে। বিগত মাত্র এক বছরে বয়লার লিকেজ, ড্রেন লাইন লিকেজ ও জেনারেটর বিকল হওয়ার মতো একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট মোট ২৭ বার বন্ধ হয়েছে, আর কয়লার অভাবের কারণে বন্ধ রাখতে হয়েছে আরও ৩ বার। গত জুনে ২ নম্বর ইউনিট কয়েক দফা বয়লার সংকটে বন্ধ হওয়ার পর জুলাই ও চলতি আগস্টেও নিয়মিত বিরতিতে এই ফ্ল্যাগশিপ প্ল্যান্টের উৎপাদন থমকে গেছে। ভারতীয় এনটিপিসি এবং বাংলাদেশের পিডিবির ৫০-৫০ মালিকানাধীন এই কেন্দ্রে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ এবং ইউনিট প্রতি উচ্চমূল্য শোধ করার পরও এর চরম বেহাল দশা খোদ দেশের বিদ্যুৎ বিভাগ ও নীতিনির্ধারকদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও উচ্চপর্যায়ের অদক্ষতা এই প্রকল্পটির সংকটকে আরও কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি কেন্দ্রের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) এবং সাধারণ ব্যবস্থাপক (জিএম) সহ ১২ জন ভারতীয় কর্মকর্তার মধ্যে ৯ জনই বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কোনো রূপ লিখিত অনুমতি না নিয়ে একযোগে ভারতে চলে যান, যার ফলে পুরো প্ল্যান্টের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা এক চরম সংকটে পড়ে। পরবর্তীতে সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে তাদের আর কর্মস্থলে ফিরতে দেয়নি এবং ভারতীয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এনটিপিসির মাধ্যমে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ করতে বাধ্য হয়। বছরের পর বছর সাধারণ রোগীকে বিদ্যুৎ সরবরাহ না করেও বসিয়ে বসিয়ে শত শত কোটি টাকা ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ হিসেবে পকেটে পুরছে এই কেন্দ্রটি, যা সরকারের রাজস্ব নীতিকে চরম ঝুঁকিতে ফেলার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করছে।
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের এই ভয়াবহ ঘাটতির সরাসরি ও নির্মম শিকার হচ্ছেন রাজধানী ঢাকার বাইরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষি, শিল্প ও প্রান্তিক সাধারণ মানুষ। খুলনা, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর কিংবা গাজীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে দিনে ৮ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত লোডশেডিং চালানো হচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনার বাটিয়াঘাটা উপজেলার ৫০০টিরও বেশি আধা-নিবিড় চিংড়ি খামারে টানা বিদ্যুৎ না থাকায় পানি সঞ্চালন বা অ্যারোটর চালানো বন্ধ হয়ে পানির অক্সিজেন লেভেল আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাচ্ছে, যা কয়েক কোটি টাকার রপ্তানিযোগ্য চিংড়ি নষ্ট হওয়ার উপক্রম ঘটিয়েছে। ক্ষুদ্র চাষীদের পক্ষে প্রতিদিন লিটার লিটার ডিজেল কিনে জেনারেটর চালানো কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। একইভাবে রাজশাহী ও নাটোরের পল্লি বিদ্যুৎ সমিতিগুলোতে চাহিদার মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ মেলায় সেখানকার হাজার হাজার গভীর নলকূপ ও সেচ পাম্প স্তব্ধ হয়ে পড়েছে, যার ফলে চলতি রোপা আমন মৌসুমে খাদ্য উৎপাদন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
শিল্পাঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি আরও বেশি করুণ রুপ ধারণ করেছে; বিশেষ করে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শত শত পোশাক কারখানায় বিদ্যুৎ না থাকায় দৈনিক ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার কার্যঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। প্রতিদিন জেনারেটর চালুর প্রাথমিক সময়ক্ষেপণ ও জ্বালানি খরচ যুক্ত হয়ে প্রতিটি কারখানার উৎপাদন ব্যয় একলাফে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির নির্ধারিত ডেডলাইন মিস হওয়ার আশঙ্কায় তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা। দীর্ঘায়িত এই লোডশেডিং শিশু, বৃদ্ধ এবং সাধারণ রোগীদের দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, কেবল দামি তেল কিনে সংকট মোকাবিলার এই সাময়িক আত্মঘাতী প্রবণতা বন্ধ করে অনতিবিলম্বে দেশের গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা, রামপালের মতো ত্রুটিপূর্ণ মেগা অবকাঠামো সংস্কার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি বৃদ্ধিতে নজর না দিলে অচিরেই পুরো দেশের অর্থনীতি এক দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
তথ্যসূত্র: দ্যা ডেইলি স্টার ও যুগান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category