স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণ-পরবর্তী বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং এশিয়ার অন্যতম বড় বাণিজ্যিক জোটে যুক্ত হতে কৌশলগত কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে বাংলাদেশ। আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) জোটে যোগদান, এলডিসি তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা আরও তিন বছর বৃদ্ধি এবং একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনে নিউজিল্যান্ডের নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা চেয়েছে ঢাকা। ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের (এমএফএটি) সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে এই সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করা হয়। বাণিজ্যের খাতকে বহুমাত্রিক ও টেকসই করার লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দল এবং নিউজিল্যান্ডের ট্রেড নেগোসিয়েশনস অ্যান্ড পলিসি ডিভিশনের বিভাগীয় প্রধান সারা মেম্যান্ডের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল এই গুরুত্বপূর্ণ সংলাপে অংশ নেয়।
আরসিইপি জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির অগ্রগতি তুলে ধরে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল স্পষ্ট করে যে, সদস্যপদ লাভের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশ্নাবলির যাবতীয় জবাব ইতোমধ্যেই জমা দেওয়া হয়েছে। জোটটির উচ্চমানের বাণিজ্যিক নীতিমালা ও কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিভিন্ন নীতিতে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্যে আরসিইপির অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা ও প্রভাবশালীদের তালিকায় নিউজিল্যান্ডের অবস্থান থাকায় এই জোটে বাংলাদেশের মসৃণ প্রবেশের ক্ষেত্রে ওয়েলিংটনের সরাসরি সমর্থন চাওয়া হয়। পাশাপাশি, বাংলাদেশের উদীয়মান সংবেদনশীল শিল্প খাত ও অভ্যন্তরীণ পণ্যের সুরক্ষায় আসিয়ানের তুলনামূলক কম উন্নত দেশগুলোর ন্যায় বাংলাদেশকে ১৫ থেকে ২০ বছরের জন্য পর্যায়ক্রমিক শুল্ক কমানোর নমনীয় সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বাণিজ্যিক সহযোগিতার পাশাপাশি ২০২৬ সালের নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তে এলডিসি উত্তরণের মেয়াদ ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের করা আবেদনের পক্ষেও নিউজিল্যান্ডের সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক সমর্থন চেয়েছে ঢাকা। বৈঠকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু সংকট, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আর্থসামাজিক পুনর্গঠনের বাধ্যবাধকতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়। ঢাকা পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, উত্তরণ প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জনে জাতীয় অবকাঠামো ও নীতিমালা প্রস্তুত করতে এই বাড়তি তিন বছর সময় অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে একটি বাণিজ্যবান্ধব পূর্ণাঙ্গ এফটিএ স্বাক্ষরের ওপর গুরুত্বারোপ করে বৈঠকে প্রস্তাব করা হয় যে, এর ফলে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বিশাল বাংলাদেশি বাজারে নিউজিল্যান্ডের দুগ্ধজাত পণ্য, কৃষিতে ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও ধাতব পণ্যের বিপুল সম্ভাবনাময় বাজার উন্মুক্ত হবে। বিপরীতক্রমে, বৈশ্বিক সুবিধা হারানোর পর নিউজিল্যান্ডের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক, উচ্চমানের ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের শুল্কমুক্ত ও স্থিতিশীল প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হবে, যা উভয় দেশের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য ব্যবস্থা তৈরি করবে।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক যোগাযোগ নিয়মিত ও স্থায়ী করতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মূলত তিনটি কৌশলগত সুপারিশ পেশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে আরসিইপি ও এলডিসি-উত্তর বাণিজ্য সুবিধা পর্যবেক্ষণে একটি স্থায়ী ‘দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নীতি পরামর্শক গ্রুপ’ গঠন, প্রস্তাবিত এফটিএ নিয়ে প্রাথমিক কাজ শুরু করতে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ তৈরি এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের আবেদনের পক্ষে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন নিশ্চিত করতে নিউইয়র্কে দুই দেশের কূটনৈতিক মিশনের সমন্বয় জোরদার করা। উভয় দেশই মুক্ত বাণিজ্যের এই সম্ভাব্য সুযোগগুলোকে বাস্তবায়নে ভবিষ্যতে ইতিবাচকভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।