বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সহযোগিতা বাড়াতে যৌথ বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর চেম্বার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সিঙ্গাপুরের একটি স্থানীয় হোটেলে বাংলাদেশ চেম্বার অব সিঙ্গাপুর আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি এ প্রস্তাব দেন।
সভায় সিঙ্গাপুরে থাকা বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার বর্তমান পরিস্থিতি, সম্ভাবনা ও বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তারা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শ্রমবাজারে সুযোগ সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশ বিজনেস চেম্বার অব সিঙ্গাপুরের সভাপতি সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরে বলেন, দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক উন্নয়নে চেম্বার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতেও কাজ চলছে। সম্প্রতি বিনিয়োগসংক্রান্ত একটি বিল মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, জনশক্তি রপ্তানি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসংক্রান্ত বিষয় সমন্বয়ের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি পৃথক উইং গঠন করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে উইংটি কাজ করবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), প্রযুক্তি, ওষুধ শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (টিভিইটি) খাতে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে সহযোগিতার বড় সুযোগ রয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, সিঙ্গাপুরের বাজারে পাট ও পাটজাত পণ্য বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্য হতে পারে। এ জন্য গবেষণা, উদ্ভাবন ও কার্যকর নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।
দুই দেশের ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে যৌথ চেম্বার গঠনের প্রস্তাব দিয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সহযোগিতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সভায় ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে ডাটা সেন্টার স্থাপনকে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ খাত হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
ব্যবসায়ীরা জানান, এফটিএ হলে ইস্পাত, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্পসহ বিভিন্ন খাতের বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
এ ছাড়া সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি পণ্যের প্রদর্শনী আয়োজন, সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু, ব্যাংক হিসাব খোলার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং ব্যবসায়িক কর্মশালা ও বাণিজ্য মেলার আয়োজনের প্রস্তাব দেন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা।
সভায় চিকিৎসক, প্রকৌশলী, জাহাজ নির্মাণ শ্রমিক, তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী, পরিবহন ও নির্মাণ খাতের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। তারা সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে বয়স্কদের সেবাদান খাতকে সম্ভাবনাময় হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রবাসী বাংলাদেশিরা সিঙ্গাপুরে অভিবাসন ব্যয় বেশি হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির অনিয়মের কারণে কর্মীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা। এ সময় তারা স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, অভিবাসন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে সরকার কাজ করছে। দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে টিভিইটি খাত সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়েও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
সভায় আইটি, ডাটা অ্যানালাইসিস, সাইবার নিরাপত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।
সমাপনী বক্তব্যে শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের সব দেশের বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত। তিনি প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের দেশে বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধানের আহ্বান জানান।
মতবিনিময় সভায় উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো লিখিতভাবে দিলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।