• শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:২৮ অপরাহ্ন

বাদল সৈয়দ / ১ Time View
Update : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬

১) অদ্ভুত কথার আড্ডা-
আমি যখন মাঠ পর্যায়ে ট্যাক্স কমিশনার হিসেবে কাজ করতাম তখন মাঝে মাঝে একটু ভিন্ন টাইপের একটি প্রোগ্রাম করতাম।
প্রোগ্রামটির নাম ছিল- ‘ক্রিটিসাইজ ইয়োরসেলফ’। সে প্রোগ্রামের উদ্দেশ্য ছিল, আমরা নিজেরা নিজেদের দোষত্রুটি তুলে ধরব। তারপর পরের প্রোগ্রামের আগে সে ত্রুটি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করব।
একদিন ফারুক নামের একজন সহকর্মী বললেন, ‘স্যার, আমার বড় সমস্যা হচ্ছে, আমি খুব ছোট ব্যাপারে বড় প্রতিক্রিয়া দেখাই। যেমন, আমার স্ত্রী হয়তো আমার ফোন ধরল না, আমি খুব রাগ করি। চা দিতে দেরি করল, আমি রেগে যাই। খুব তুচ্ছ ব্যাপারে আমার মেজাজ খারাপ হয়। আমি বুঝি আমার এ রিয়্যাকশন ঠিক না, কিন্তু আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।‘
আমি তাৎক্ষণিকভাবে তার সাথে ব্যাপারটি নিয়ে সবার সামনে আলাপ করলাম না। পরে একদিন তার সাথে ব্যাপারটি নিয়ে আলাপ করে জানতে পারলাম, ছোটবেলায় সে বাবা হারিয়েছে। তাই সে বড় হয়েছে মামা বাড়িতে। অনেকটা বাধ্য হয়ে আশ্রয় দিলেও মামা তাদের প্রতি খুব বিরক্ত ছিলেন। তাই নানাভাবে তিনি এবং তাঁর স্ত্রী তাকে অপমান ও অবহেলা করতেন। সে কষ্ট সে ভুলতে পারে না- তাই কেউ সামান্য অবহেলা করলে তার রাগ উঠে যায়।
ফারুকের এই অযৌক্তিক আচরণ ইমোশনাল উন্ড থেকে তৈরি বলে আমার ধারণা।
২) ইমোশনাল উন্ড কী?
ইমোশনাল উন্ড হচ্ছে, অতীতের কোনো কষ্টকর অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি মানসিক ক্ষত, যা ভবিষ্যতেও মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করে। সেটির নেতিবাচক প্রভাব যুগের পর যুগ মানুষটির মধ্যে থেকে যায়।
৩) কী কারণে ইমোশনাল উন্ড সৃষ্টি হয়?
*** অতীতের অবহেলা।
*** অতীতের অপমান।
*** অতীতের প্রত্যাখ্যান।
*** বিশ্বাসভঙ্গের অভিজ্ঞতা।
*** অন্যায়ের অভিজ্ঞতা।
৪) ইমোশনাল উন্ড যেভাবে প্রভাব ফেলে…
ইমোশনাল উন্ড মানুষের আচরণে কিছু বিরূপ প্রভাব ফেলে, যা নিজেকেও ভোগায়- অন্যদেরও ভোগায়।
যেমন-
*** এ সমস্যা যাদের থাকে তাঁরা খুব ছোট ঘটনায় বড় প্রতিক্রিয়া দেখান।
*** তাঁদের মধ্যে সব সময় অপমান ও প্রত্যাখানের ভয় কাজ করে।
*** তাদের মধ্যে সব সময় প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয় কাজ করে।
*** তাঁরা সহজে কাউকে বিশ্বাস করেন না।
*** তাঁদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব থাকে।
৫) কীভাবে কাটানো যায়…
ক। Trigger চিনুন-
ইমোশনাল উন্ড থেকে উদ্ধার পাওয়ার অন্যতম কার্যকর পদ্ধতি হলো কোন পরিস্থিতিতে ঘটনার তুলনায় অনেক বেশি প্রতিক্রিয়া দেখানো হচ্ছে তা চিহ্নিত করা। এটি চিহ্নিত করে সে পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না দেখালে এই ক্ষতের যন্ত্রণা থেকে আপনি মুক্তি পেতে পারেন।
খ। উল্টো চিন্তা-
যখনই মনে হয়, আমি পারব না, তখনই ভাবুন আপনি কতবার পেরেছেন।
যতবার মনে হয়, সবাই আমাকে ছেড়ে যায়, ততবার ভাবুন কতজন আমার সাথে আছে, ছেড়ে যায়নি।
কী পাননি, তা নয়, কী পেয়েছেন তা নিয়ে ভাবুন।
অতীতের কষ্টের বিপরীতে বর্তমানের ভালোবাসার কথা, সাফল্যের কথা ভাবুন। উপকার পাবেন।
গ। যৌক্তিক হন-
যাদের আচরণকে অবহেলা ভাবছেন, যুক্তি দিয়ে তাদের আচরণ বিচার করুন। দেখবেন সে আচরণের যৌক্তিকতা পাবেন। যা আপনার ইমোশনাল উন্ডে মলম লাগাবে। ফোন ধরেনি বলে স্ত্রীর ওপর রাগ করছেন? তখন হয়তো তিনি বাচ্চাকে খাওয়াচ্ছিলেন। এটি জানতে পারলে আপনার রাগ থাকবে?
ঘ। আত্মবিশ্বাস-
নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন। খেয়াল করে দেখুন, আপনি যা পারেন তা অনেকে পারেন না। আপনি যা অর্জন করেছেন, তা অনেকে করেননি।
‘A man collapses into ashes, then rises from the ashes.’
‘মানুষ মাঝে মাঝে ধ্বংস হয়ে ছাই হয়ে যায়, তারপর সেই ছাই থেকে উঠে দাঁড়ায়। ‘
আপনিও মানুষ -তাহলে নিজের অতীতের ছাই থেকে উঠে দাঁড়াতে পারবেন না কেন?
ঙ। প্রফেশনাল সাহায্য-
কোনোভাবেই যদি ইমোশনাল উন্ড থেকে বেরুতে না পারেন সাইকোলজিস্টের সাহায্য নিন।
৬) গোলাপের কাঁটা-
ফারুককে আমি বলেছিলাম, ‘সবচেয়ে সুন্দর গোলাপটিতেও কাঁটা থাকে। ঠিক তেমন শুদ্ধতম মানুষেরও ত্রুটি থাকে। ইচ্ছা- অনিচ্ছায় তাঁরা ভুল করেন। যখনই কারো ওপর রাগ হবে এ কথাটি মনে রাখবে। তাহলে অতীতের বিষ তোমাকে কাবু করতে পারছে না।
আমি ঠিক জানি না, আমার পরামর্শ তার কাজে লেগেছিল কি না। কারণ এ প্রসঙ্গে সে দ্বিতীয়বার আলাপ করেনি। আমিও তার নীরবতা ভাঙার চেষ্টা করিনি।
কোনো কোনো নীরবতা ভাঙতে নেই।
#আসুন মায়া ছড়াই


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category