কয়েকদিন আগে স্বামীরা কেন স্ত্রীর রান্নার সাথে মায়ের রান্নার তুলনা করেন সে ব্যাপারে আমার স্ত্রী কী বলেছিলেন তা লিখেছিলাম।
এরপর আমার বন্ধু নার্গিস বলল— ‘তোমার লেখাটি পড়লাম। আচ্ছা, ভাবি কি কখনো বাচ্চারা নানাবাড়ির লোকজনের দিকে একটু বেশি ঝুঁকে পড়ে কেন তা নিয়ে কখনো বলেছে।’
আমি বললাম, ‘তা তো বলেনি।’
ও বলল, ‘হয়তো তোমার মেয়ের দুদিকের প্রতি সমান টান তাই উনি ব্যাপারটা খেয়াল করেননি। কিন্তু এখানেও গভীর একটি সত্য লুকিয়ে আছে।’
আমি বললাম, ‘সত্যটা কী বলবে।’
নার্গিস বলল, ‘ছেলেমেয়েরা বাড়িতে সারাক্ষণ মাকে বিভিন্ন হাঙ্গামার মধ্যে যেতে দেখে। রান্না-বান্না, ঘর গোছানো, তাদের দেখাশোনা, মেহমানদারি এ রকম হাজারো ঝক্কি। চাকরি করলে তো আরো সমস্যা। কাজ শেষে বাড়ি ফিরে তাকে ঠিকই সংসারের সব কাজ করতে হয়। তারা তাকে বিশ্রাম নিতে খুব কম দেখে। তার প্রতি কাউকে যত্ন নিতেও তেমন দেখে না। এটাই বাংলাদেশি মেয়েদের কমন চিত্র।’
আমি বললাম, ‘এর সাথে নানাবাড়ির দিকে টান বাড়ার সম্পর্ক কী?’
নার্গিস হাত ঝাপ্টা দিয়ে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘দাঁড়াও আরো আছে। ঈদে-পার্বণে দাদার বাড়ি গেলে তারা দেখে মাকে সেখানেও এসব দিগদারির মধ্যে যেতে হচ্ছে। বাড়ির বউ হিসাবে তার হাজারটা কাজ। সবাই ছুটিতে আরাম করে, তিনি সেখানেও উদয়াস্ত খাটেন।’
আমি কিছুটা অধৈর্য হয়ে বললাম, ‘এর সাথে নানার বাড়ির সম্পর্ক কী।’
নার্গিস বলল, ‘নানার বাড়িতে তারা দেখে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। সেখানে পৌঁছা মাত্র মা বাচ্চাদের নানা-নানি, বা মামা-খালাদের গছিয়ে দিয়ে ইচ্ছামতো ঘুমুতে পারেন। কেউ তাঁর চুলে বিলি কেটে দেয়, কেউ মাথা টিপে দেয়, কেউ চা বানিয়ে আনে। নানি মেয়ের পছন্দের রান্নাগুলো করেন। ঘুম থেকে তুলে আদর করে খেতে নিয়ে যান।’
বলতে বলতে নার্গিস দম নিলো, তারপর বলল, ‘একমাত্র বাপের বাড়িতেই মেয়েরা সংসারের ঝামেলা মুক্ত হয়ে এই বিশ্রামটা পায়। তাদের প্রতি এ যত্নটা বাচ্চাদের মুগ্ধ করে। আসলে বাচ্চারা তাদেরই পছন্দ করে যারা তাদের মায়ের যত্ন নেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্বশুরবাড়িতে তিনি সেটা পান না। তাই তাদের মধ্যে নানাবাড়ির লোকজনের প্রতি আলাদা টান তৈরি হয়।’
আমি বললাম, ‘এই যত্ন যদি তিনি দাদাবাড়িতে পান?’
‘তাহলে তাঁদের প্রতিও একই টান তৈরি হবে। অনেক বাচ্চা আছে যারা দাদা-দাদি, চাচা-ফুপু বলতে অজ্ঞান। মোদ্দাকথা হলো, শিশুরা তাদের মায়ের যত্ন দেখতে খুব পছন্দ করে। সেটা যে করে তাকেই সে পছন্দ করে, হোক তা দাদার বাড়ি বা নানার বাড়ি। সমস্যা হলো, দাদাবাড়িতে তাঁরা এ যত্নটা পান না। তাই বাচ্চারা নানাবাড়ির দিকে ঝুঁকে পড়ে।’
আমি আমতা আমতা করে বললাম, ‘তোমার কথায় যুক্তি আছে। এভাবে তো আগে ভাবিনি।’
নার্গিস হেসে বলল, ‘এখন থেকে সিরিয়াসলি ভাববে। কারণ বাবারাও বাচ্চাদের নজরদারির বাইরে নয়। যে বাবা তাদের মায়ের যত্ন নেয় না, বাচ্চারা তাকেও পছন্দ করে না।’
আমার ধারণা, নার্গিসের পর্যবেক্ষণটি ঠিক। প্রতিটি সন্তান তার মায়ের প্রতি অন্যদের সম্মান ও যত্ন চায়।
এ ব্যাপার আপনার মতামত কী?