মধ্যপ্রাচ্যের ভূকৌশলগত দৃশ্যপটে রিয়াদ ও আঙ্কারার যুগপৎ নেতৃত্বে ইসলামাবাদকে যুক্ত করে গঠিত নতুন নিরাপত্তা অক্ষ বৈশ্বিক কূটনীতিতে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে| প্রচলিত অর্থে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ নামে পরিচিতি পাওয়া এই মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রভাব কেবল পারস্য উপসাগর কিংবা পূর্ব ভূমধ্যসাগরের জলসীমায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এর অভিঘাত সরাসরি আছড়ে পড়েছে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের ভূরাজনীতিতেও| তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সবচেয়ে বেশি চমকে দিয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রদর্শিত ইতিবাচক মনোভাব| সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি উন্নয়নশীল দেশের এমন সংবেদনশীল বহুজাতিক সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ একদিকে যেমন ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের হিসাবনিকাশ নাড়িয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে প্রতিবেশী নয়াদিল্লির কপালে ফেলেছে গভীর চিন্তার ভাঁজ| বহুমুখী আঞ্চলিক স্বার্থ ও বৈরী শক্তির সংঘাতের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে ঢাকা আদৌ এই সামরিক দায়ভার বহনে সক্ষম কি না, তা নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক মহলে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে|
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও বৈরী সামরিক দ্বন্দ্ব সর্বজনবিদিত| সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যদি আনুষ্ঠানিকভাবে রিয়াদ-আঙ্কারা-ইসলামাবাদ অক্ষের সামরিক বলয়ে নিজেদের নাম লেখায়, তবে তা সামগ্রিক আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে রাতারাতি উল্টে দেবে| নয়াদিল্লির নীতিপ্রণয়নকারীরা এই সম্ভাব্য সমীকরণকে গভীর শঙ্কা ও অস্বস্তির চোখে দেখছেন| ভারতের মূল উদ্বেগটি নিহিত রয়েছে ভবিষ্যৎ সামরিক সংকটের আশঙ্কায়; যদি কখনো ইসলামাবাদের সঙ্গে কোনো সরাসরি সংঘাতের সৃষ্টি হয়, তবে কৌশলগত মিত্র হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের সামরিক ব্লকের অংশীদারে পরিণত হতে পারে| এতে ভারতের পূর্ব সীমান্তে এতদিন বজায় থাকা তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে| তবে আন্তর্জাতিক গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে ঢাকার এই কৌশলগত পদক্ষেপে সুবিধার চেয়ে ঝুঁকির পাল্লাই বেশি ভারী| অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষক মোহাম্মদ আলী জাফরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক সীমানার বাইরে দূরবর্তী কোনো আন্তর্জাতিক সামরিক বিরোধের দায় কাঁধে তুলে নেওয়ার বাস্তবসম্মত কোনো কৌশলগত যুক্তি বাংলাদেশের নেই| সাম্প্রতিক সময়ের তীব্র অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্তরণের পর এই মুহূর্তে এত বড় একটি বহুমুখী সামরিক জোটে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়া জাতীয় নিরাপত্তার জন্য আত্মঘাতীও হতে পারে|
এদিকে জোটের বিস্তৃতি নিয়ে পশ্চিম এশিয়ার আরেক প্রভাবশালী রাষ্ট্র মিসরকে নিয়েও তৈরি হয়েছে তীব্র ধূম্রজাল| কায়রো এই জোটে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কূটনৈতিকভাবে বিবেচনা করলেও সরাসরি কোনো সামরিক প্রতিশ্রুতি দিতে স্পষ্টতই চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে| এর নেপথ্যে কাজ করছে দেশটির দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা| ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ক্যাম্প ডেভিড বা মিসর-ইসরায়েল শান্তি চুক্তির ছয় নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বিধিবদ্ধ রয়েছে যে, মিসর এমন কোনো দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক সামরিক চুক্তিতে সই করতে পারবে না যা ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখার শর্তকে লঙ্ঘন করে| মক্কা চুক্তির ভবিষ্যৎ কোনো সামরিক পদক্ষেপ বা নিরাপত্তা তৎপরতা যদি কোনো কারণে তেলআবিবের স্বার্থের প্রতিকূলে যায়, তবে কায়রো সরাসরি আন্তর্জাতিক আইনি ও মারাত্মক কূটনৈতিক সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত হবে| এছাড়া প্রেসিডেন্ট সিসির নেতৃত্বাধীন মিসর বর্তমানে তুরস্ক, গ্রিস, সাইপ্রাস এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে অত্যন্ত নাজুক ভারসাম্য বজায় রেখে এক ধরণের ভারসাম্যপূর্ণ নীতি বজায় রেখে চলছে, ফলে কোনো একটি একক বলয়ে ঢুকে অন্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে হাতছাড়া করার ঝুঁকি তারা নিতে নারাজ|
পুরো ঘটনাপ্রবাহের ওপর অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টি রাখছে ইসরায়েলও| তেলআবিবের কৌশলগত উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মূলত তুরস্কের ভূমিকা| তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের হাত ধরে নব্য-অটোমান প্রভাব ও ইসলামিক ঐক্যের ব্যানারে নতুন ভূকৌশলগত অক্ষ গড়ে তোলার যে অভিপ্রায় প্রকাশ পেয়েছে, তা পশ্চিম এশিয়ায় ইসরায়েলের তথাকথিত আব্রাহাম চুক্তি কাঠামোর স্বাভাবিক বিকাশকে বড় ধরনের বাধার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে| তবে এই জোটের সবচেয়ে প্রহেলিকাময় ও পরস্পরবিরোধী অধ্যায়টি তৈরি হয়েছে ইরানকে ঘিরে| শিয়া প্রধান রাষ্ট্র তেহরানের এই জোটে যোগদান নিয়ে খোদ তাদের দেশের ভেতরেই বিপরীতমুখী বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে| ইরানের পার্লামেন্ট-ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করেছে যে তারা মক্কা জোটে যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পেয়েছে, কিন্তু দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা সরাসরি ও কঠোর ভাষায় নাকচ করে দিয়েছে| বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির মূল নিরাপত্তা আর্কিটেকচার বা সুরক্ষাবলয়টি ভেতর থেকেই এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সামরিক ও প্রক্সি নেটওয়ার্কের বিস্তারকে নিবৃত্ত করতে পারে| ফলে তেহরান এতে অংশ নিলে তাদের নিজস্ব ছায়াযুদ্ধ ও বিপ্লবী সামরিক কৌশলে বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ চলে আসবে| প্রতিষ্ঠাতা তিন রাষ্ট্রও ইরানের সামরিক ভূমিকা নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কিত, যদিও তাত্ত্বিকভাবে তেহরান যদি শেষ পর্যন্ত যুক্ত হয়, তবে এটি নিছক আঞ্চলিক পর্যায় ছাড়িয়ে এক দানবীয় বৈশ্বিক রূপ ধারণ করবে|
এই বহুমুখী মেরুকরণের মধ্য দিয়ে এককভাবে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ও কৌশলগত ফায়দা ঘরে তুলেছে পাকিস্তান| অর্থনৈতিকভাবে জর্জরিত দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ধনী দেশ সৌদি আরব এবং ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিশালী সামরিক শক্তি তুরস্কের সঙ্গে সমমর্যাদার প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে নিজেদের কেবল দক্ষিণ এশীয় সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখেনি, বরং বৈশ্বিক রঙ্গমঞ্চে একটি অপ্রতিরোধ্য মধ্যম সামরিক শক্তি বা মিডল পাওয়ার হিসেবে নিজেদের অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করেছে| এই বিকাশকে আবার ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে বিশ্বের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি| বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর এই স্বতন্ত্র যৌথ জোট মার্কিন একক বৈশ্বিক আধিপত্যকে সংকুচিত করে একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে| বিপরীতভাবে ওয়াশিংটনের ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এই উদ্যোগকে নেতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে না, কারণ তাদের দীর্ঘমেয়াদি নীতি অনুযায়ী আঞ্চলিক দেশগুলো যদি নিজেদের সুরক্ষার খরচ নিজেরাই বহন করে, তবে সরাসরি বিপুল সেনা মোতায়েনের অর্থনৈতিক ব্যয়ভার থেকে মার্কিন প্রশাসন রক্ষা পায়| একই সঙ্গে সেখানে বিপুল অঙ্কের সমরাস্ত্র বিক্রি, নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক প্রভাব বজায় রেখে কলকাঠি নাড়ার সুযোগ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতে ঠিকই থেকে যায়|
সব মিলিয়ে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিছক কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তনের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও স্পর্শকাতর প্রতীক| বাংলাদেশ যদি আবেগের বশে কিংবা স্বল্পমেয়াদি কৌশলগত অর্জনের আশায় এই বহুজাতিক সামরিক জোটে চূড়ান্তভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে হয়তো ক্ষণিকের জন্য তার দরকষাকষির সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে| কিন্তু তার বিপরীতে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্কে যে তীব্র অবিশ্বাস ও টানাপোড়েন তৈরি হবে, তা সামাল দেওয়া ঢাকার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে| একই সঙ্গে দূরবর্তী সামরিক সংঘাতের অনাকাঙ্ক্ষিত দায়ভার এসে পড়বে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর| নতুন নতুন রাষ্ট্র অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে জোটটির বাহ্যিক শক্তি দৃশ্যত ফুলেফেঁপে উঠলেও, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব বিপরীতমুখী ভূরাজনৈতিক স্বার্থ, অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং ঐতিহাসিক সংঘাত শেষ পর্যন্ত এই জোটকে ভেতর থেকে বড় ধরনের ভাঙন ও সংকটের ঝুঁকির মধ্যেই ফেলে রাখবে|