আমার এক খালা আছেন। তাঁর চার সন্তানই দেশের বাইরে থাকে। খালু মারা গেছেন। খালাকে ছেলেমেয়েরা নিজেদের কাছে নেওয়ার অনেক চেষ্টা করেছে। তিনি রাজি হননি।
যখনই খালার বাসায় যাই—তাঁর মধ্যে হাহাকার লক্ষ্য করি। যতক্ষণ থাকি, ততক্ষণ বাচ্চাদের কথা বলেন। এক ধরনের শূন্যতা তাঁকে তাড়া করে।
মনোবিজ্ঞানে সন্তানবিচ্ছেদের এই শূন্যতার একটি নাম আছে।
‘এম্পটি নেস্ট সিনড্রোম।’
বাড়িটা খালি খালি লাগে।
অনেকের জীবনেই এই শূন্যতা দেখি। তাঁদের কারও বাচ্চা বাইরে, কারও দেশেই, কিন্তু বিভিন্ন কারণে আলাদা থাকে।
মনে হয়, ছানা উড়ে যাওয়ায় মা কিংবা বাবা পাখি অস্থির হয়ে ডানা ঝাপটাচ্ছে।
তাঁদের জন্য এই লেখা।
১) সন্তান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কলিজার টুকরা। কিন্তু তাই বলে তাকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দু বানাবেন না। নিজের আনন্দ, শখ, বন্ধুত্ব ধরে রাখুন। পরে একা হয়ে গেলে কাজে লাগবে। সন্তানই যদি আপনার একমাত্র পৃথিবী হয়, তবে ওর বিচ্ছেদে খুব কষ্ট পাবেন।
২) সন্তান নাড়িছেঁড়া ধন। তবে এটাও ঠিক, যেদিন নাড়ি ছিঁড়েছে, সেদিন থেকে সে আলাদা মানুষ। আলাদা মানুষের আলাদা বাড়ি হতেই পারে—যেমন আপনার হয়েছিল।
৩) সে যদি আপনার ওপর নির্ভরশীল হতো—নিজের পায়ে না দাঁড়াত, সেটা কি ভালো হতো? এভাবে ভাবুন।
৪) দেশে থাকলেই কি সে আপনার সঙ্গে থাকত? বাস্তবতা বলে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে থাকে না। বরং দেশে আলাদা থাকলে হয়তো আপনার আরও বেশি খারাপ লাগত।
৫) সন্তানের খাট, চেয়ার-টেবিল, ব্যবহারের জিনিসপত্র মূল্যবান স্মৃতি। কিন্তু সেগুলো যদি আপনার কষ্ট বাড়ায়, তবে তা সাজিয়ে রেখে জাদুঘর না বানানোই ভালো।
৬) নিয়মিত কথা বলুন, ভিডিও কল দিন। অনেক ভালো লাগবে। তবে ও কখনো কখনো ফোন না করলে বা না ধরলে রাগ করবেন না। সে কিন্তু কম ব্যস্ত নয়।
৭) সম্ভব হলে ঘুরতে যান, আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের বাসায় বেড়াতে যান বা তাঁদের বাসায় ডাকুন। এখন পুরোনো বন্ধুরা নিজেদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলছেন—সেগুলোতে যোগ দিতে পারেন।
৮) ওর প্রত্যাবর্তনের দিন গোনা বাদ দিন। সে চাইলেই কি সঙ্গে সঙ্গে আসতে পারবে? তাই তার প্রতীক্ষায় দিন কাটিয়ে কষ্ট পাবেন না। আসুক না ও, যখন সময় হবে।
৯) বাস্তবতা বলে, বেশি কাছে থাকলে অনেক সময় সম্পর্কে তিক্ততা দেখা দেয়। দূরে গেলে তা কম হয়।
১০) জীবনসঙ্গীকে আরও কাছে টানুন। আসলে আপনারা দুজনে দুজনার। যত কাছে টানবেন, তত শূন্যতা কম ভোগাবে।
জীবনসঙ্গী না থাকলে ব্যস্ততার কাজ বের করুন। সেটা বারান্দায় বাগান করা থেকে বাচ্চাদের অক্ষরজ্ঞান শেখানো যেকোনো কিছু হতে পারে—যা আপনার ভালো লাগে।
আমরা যারা বাবা-মা, তারা আসলে একটি পাখির বাসা তৈরি করি। সেখানে ছানাপোনা জন্মায়। বড় হয়। তারপর ডানা গজালে উড়াল দেয়।
কখনো বিদেশে যায়—কখনো দেশেই আলাদা হয়ে যায়।
মেয়ে হলে বিয়ে হয়ে যায়! অনেক ছেলেও বাস্তব কারণে বিয়ের পর নতুন ঘর বাঁধে।
আসলে ওর বাড়িটা ঝুলছে অন্য গাছের ডালে।
এই অনিবার্য সত্যটা মেনে নিয়ে নিজের মতো জীবন সাজালে অত খারাপ লাগবে না।
#আসুন মায়া ছড়াই