১) হাসির পেছনে কান্না…
আমার এক বন্ধু। নাম আনোয়ার। কয়েক দিন আগে আমার অফিসে এলো। বেশ দীর্ঘ বিরতির পর দেখা।
তাকে আমার খুব উচ্ছল মনে হলো। কথায় কথায় রসিকতা করছে, হো হো করে হাসছে।
ও উঠে যাওয়ার সময় আমি বললাম, ‘দোস্ত, কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করি? আমরা ছোটবেলার বন্ধু, তাই বলছি।’
সে বলল, ‘একশ একটা প্রশ্ন কর। হাহাহাহা।’
‘তুই কি কোনো সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিস?’
দপ করে তার হাসি নিভে গেল। বলল, ‘কীভাবে বুঝলি?’
‘তোর হাসি দেখে। এটা স্বাভাবিক হাসি না। ইউনিভার্সিটি লাইফ থেকে আমি তোকে রগে রগে চিনি।’
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর বলল, ‘দোস্ত, আমার ব্যবসায় ধস নেমেছে। অনেক টাকা লোন। পার্টনারশিপ ব্যবসা। বাকি তিনজন আমার ঘাড়ে সব চাপিয়ে পালিয়েছে। সব সম্পত্তি বিক্রি করেও লোন শোধ করতে পারছি না। তার ওপর তোর ভাবির ক্যানসার ধরা পড়েছে। থার্ড স্টেজ। খুব চাপে আছি। যাতে কেউ তা না বোঝে, তাই জোর করে হাসি।’
আনোয়ারের কথা থেকে আজকের লেখার জন্ম।
২) রক্তাক্ত কান্না…
আনোয়ার যে হাসির আড়ালে তীব্র বিষণ্ণতা লুকাতে চাইছে, মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের আচরণকে বলা হয় স্মাইলিং ডিপ্রেশন। এ ধরনের সমস্যায় আক্রান্তরা—
• হাসেন, কিন্তু ভেতরে থাকে শূন্যতা।
• নিজের কষ্ট গোপন রাখেন।
• কিছুতে আনন্দ পান না।
• নিজে কষ্টে থেকেও অন্যকে আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করেন।
যে বিষণ্ণতা প্রকাশ পায়, তা অন্যরা বুঝতে পারে এবং সহায়তা করতে পারে। স্মাইলিং ডিপ্রেশন হাসি দিয়ে ঢেকে রাখায় তা বোঝা যায় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তা বিধ্বংসী।
প্রশ্ন হচ্ছে, এ ডিপ্রেশন কীভাবে দূর করা যায়?
এর কারণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর উত্তর।
ক) কেউ কেউ দুর্বলতা প্রকাশ করতে চান না। এটা ঠিক নয়। সমস্যার কথা আপনজনদের সাথে শেয়ার করুন। লড়াইটা একা না করে সবাই মিলে করুন। অনেক শান্তি পাবেন।
খ) পরিবারের অন্যদের দুশ্চিন্তায় ফেলতে চান না বলে দুশ্চিন্তা গোপন করে অনেকে হাসেন। এই হাসির দরকার নেই। এভাবে চেপে রাখলে তা পরিবারকে আরও বিপদে ফেলতে পারে।
গ ) ভালো থাকার অভিনয় বাদ দিন। যা সত্য, তা প্রকাশ করুন। ভান করে সমস্যার সমাধান হয় না।
ঘ) প্রয়োজন হলে পেশাদার বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন। বিষণ্ণতার ভালো চিকিৎসা আছে।
৩) আমার নিজস্ব পদ্ধতি…
জীবনে অনেক কঠিন মুহূর্ত আমিও মোকাবিলা করেছি। ভেতরে রক্তধারা নিয়ে ওপরে হাসার অভ্যাস আমারও ছিল। তারপর একদিন একজনের কথা খুব বুকে বিঁধল। তা হলো, ‘যে সমস্যার সমাধান আপনি করতে পারবেন, তা নিয়ে চিন্তা করছেন কেন? সমস্যার সমাধান তো আপনার হাতে। আর যে সমস্যার সমাধান আপনার হাতে নেই, তা নিয়ে চিন্তা করছেন কেন? চিন্তা কি সমস্যা সমাধান করতে পারবে?’
সেদিন থেকে আমি আর সমস্যা নিয়ে অতিরিক্ত মাথা ঘামাই না।
সমাধানযোগ্য হলে তা করব, আর সমাধানযোগ্য না হলে গা ভাসাব। দেখি না ভাসতে ভাসতে কোথায় নেয়? পদ্ধতিটা বেশ কাজের।
৪) হৃদয় মন্দির…
আমি আনোয়ারের দিকে তাকালাম। সে নিঃশব্দে কাঁদছে। আমি কোনো কথা না বলে তার কাঁধে হাত রাখলাম। নিঃশব্দ হৃদয়ের ভাষা অনেক শক্তিশালী।
নজরুল তো আর এমনি এমনি হৃদয়কে মন্দির বলেননি!
***
পাদটীকা:আমি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নই। অভিজ্ঞতা থেকে লিখলাম। লেখাটি শেয়ার করা যাবে।
#আসুনমায়াছড়াই