• শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৭ অপরাহ্ন

নারকেল গাছের আগায় বসে…

বাদল সৈয়দ / ০ Time View
Update : শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬

আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। সাবু ভাই ক্লাস নাইনে। আমাদের ক্লাবের লিডার। সবসময় মুখ গোমড়া করে থাকেন, কারণ হাসলে নাকি লিডারগিরির ওজন কমে যায়।
একদিন আমি কলোনি মার্কেটে হাঁটছি, লক্ষ্য মুদির দোকান। তারা খাঁচিতে খোলা গুড় রাখে। আমার প্ল্যান হচ্ছে, সুযোগ বুঝে কোনো দোকানিকে ভজিয়ে এক টুকরা গুড় নেওয়া। এরা সবাই পরিচিত। মনমেজাজ ভালো থাকলে মাঝে মাঝে দেন—খারাপ থাকলে দৌড়ানি দেন। দৌড় দিতে আমার আপত্তি নাই, গুড়ের মতো বেহেশতি খানা ফ্রি পেতে হলে একটু রিস্ক নিতেই হয়।
এমন সময় পেছন থেকে সাবু ভাই মিহি গলায় ডাক দিলেন, ‘বাদল, শোন।’
খুব অবাক হলাম। লিডারের গলা এত মিহি কেন? তিনি তো ঢোলের আওয়াজের মতো কথা বলার চেষ্টা করেন। তবে ঢোলের শব্দ তেমন ফোটে না—ছোটো ঢোল তো তাই, মাত্র ক্লাস নাইনে পড়ে।
আমি তাঁর কাছে যেতেই গলা আরও মিহি হয়ে গেল, ‘ইগলু আইসক্রিম খাবি?’
এবার বিস্ময়ের বাপ-দাদারা নেমে এল।
সাবু ভাই খাওয়াবেন ইগলু আইসক্রিম! উনি একটা চুইংগাম কিনে চিবিয়ে তা কাগজে মুড়ে রেখে দেন। তারপর এক মাস চিবান। কিপটার কিপটা! উনি খাওয়াবেন আইসক্রিম!
তবে আমি তো না করার বান্দা না। উনি চুষে আধখাওয়া আইসক্রিম দিলেও খেয়ে ফেলব!
‘খাবো, ভাইয়া।’
‘আচ্ছা। তার আগে একটা কাজ করতে হবে।’
‘কী কাজ?’
এবার লিডারের গলা আটকে গেল, মুখে লজ্জা লজ্জা ভাব, ‘নিলু আছে না, ওই যে রুস্তম চাচার মেয়ে, ও একটা ভাবসম্প্রসারণ রেডি করে দিতে বলছিল। ওরে সেইটা পৌঁছে দিতে হবে। পারবি?’
‘ভাবসম্প্রসারণ কী?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘আরে মূর্খ, এইটা হইল, একটা বাক্য থাকে, সেইটারে লম্বা কইরা লেখতে হয়। নিলুর জন্য লেখছি,’ বলে তিনি সুরে টান দিলেন—‘কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক কে বলে তা বহুদূর…।’
সুরের ঠেলায় তাঁর চোখ বন্ধ হয়ে এসেছে।
আমি উনি কী বলছেন কিছুই বুঝছি না। বোঝার দরকারও নাই। আমার দরকার আইসক্রিম। তবে একটা সমস্যা আছে। রুস্তম চাচার সাইজ গামা পালোয়ানের মতো। মাঝে মাঝে পাড়ার দুষ্ট ছেলেদের সাইজ করতে বাঁশের লাঠি নিয়ে বের হন। তাঁর বাসায় টোকা দেওয়া মানে আজরাইলের মাথায় টোকা দেওয়া। কোনো কারণে আমাকে দেখে ক্ষেপে গেলে দোজখ নামবে।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওই বাসায় পৌঁছে দিলে হবে?’
‘তুই ঠিক বিকেল চারটায় নক করলেই নিলু দরজা খুলবে। সেভাবেই কথা হইছে। ভাবসম্প্রসারণটা ওকে দিয়েই এইখানে চলে আসবি। তখন আইসক্রিম পাবি।’
‘গোটা আইসক্রিম নাকি আপনার চোষা আইসক্রিম?’
‘আরে বেয়াদ্দপ! মারব এক থাপ্পড়। চকচকে নতুন আইসক্রিম। মোড়ক খুলবি আর কামড় দিবি।’
আমার জিভে জল থইথই করছে। তবু রুস্তম চাচার কথা ভেবে বললাম, ‘ভাইয়া, নিলু আপা ওইটা জানালা দিয়া নিতে পারবে না?’
‘জানালা দিয়া কেন?’
‘আপা যদি বিকেল চারটায় পেছনের জানালায় দাঁড়ায়, তাহলে আমি পাইপ বেয়ে উঠে দিয়ে আসব। রুস্তম চাচারে ভয় লাগে তো, তাই।’
‘আরে চোরার চোরা! পাইপ বায়া দিবি কেন? পইড়া চিৎ হয়া থাকলে নিলু ভাবসম্প্রসারণ পাবে কই? কাল তার পরীক্ষা। আমার উপর বিরাট ভরসা কইরা আছে।’
‘পড়ব না। আমি তো খুব ভালো পাইপ বাই।’
‘দূর, সোজা গিয়া দরজায় টোকা দিবি, নিলু দরজা খুলবে। তুই জিনিসটা তার হাতে দিবি। কারবার শেষ। চোরের মতো পাইপ বাওনের দরকার নাই।’
‘আচ্ছা দেন।’
তিনি খুব সাবধানে একটা খাম বের করলেন, সেটির ওপর লেখা, ‘মেরি জান।’ পাশে লাল কালিতে ফুল আঁকা। গোলাপ না গেন্ধা বোঝা যাচ্ছে না, তবে ফুল এটা বোঝা যাচ্ছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘মেরি জান—কেন লিখছেন, ভাইয়া?’
‘এত প্রশ্ন করার জন্য তো তোকে ডাকি নাই। ইগলু আইসক্রিমের দাম কত জানস? এক টাকা! এত্ত দামি জিনিস খাইতে চাইলে কাজটা করতে হবে, পারবি কি না সাফ জবাব দে।’
আমি কোঁৎ করে প্রশ্ন গিলে ফেললাম। ইগলু হাতছাড়া হওয়ার অবস্থা। এ অবস্থায় বিনা প্রশ্নে দায়িত্ব পালন অত্যাবশ্যক। খামটা তাঁর হাত থেকে নিলাম। দেরি করলে কাজটা ছুটে যেতে পারে, সেই সাথে ইগলু আইসক্রিম।
ঠিক চারটায় নিলু আপার বাসার দরজায় টোকা দিলাম।
ভাবসম্প্রসারণ পৌঁছাতে সমস্যা হলো না। তা হাতে হাতে দিলাম। রুস্তম চাচাকে নিয়েও কোনো সমস্যা হলো না। রেলগাড়ির হুইসেলের মতো ঘরের ভেতর থেকে আওয়াজ ভেসে আসছে। তা কখনো নামে, কখনো ওঠে। মনে হচ্ছে ঘরটা কাঁপছে। চাচা অফিস শেষে বাসায় এসে ঘুমাচ্ছেন।
আমি বিশ্বজয়ের ভঙ্গিতে কলোনি মার্কেটে ফিরে এলাম। মনে অবশ্য কিছুটা ভয় ছিল, সাবু ভাই কথা রাখেন কি না, নাকি এক থাবড়া দিয়ে দৌড়ানি দেন। কিন্তু তিনি কথা রাখলেন। এক টাকা দিয়ে ইগলু কিনলেন। তাঁর গালভর্তি হাসি। কিপটার টাকা খরচের কোনো দুঃখ নেই! জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভাবসম্প্রসারণ দিছস? ঠিকভাবে দিছস?’
আমার উত্তর দেওয়ার সময় নাই, আইসক্রিম চুষতে চুষতে মাথা নাড়লাম। মানে দিছি, ঠিকভাবে দিছি।
পরদিন সকালে কলোনিতে কেয়ামত নামল। রুস্তম চাচা অফিস কামাই দিয়ে সাবু ভাইয়ের বাসার সামনে হাজির হয়েছেন। তাঁর গর্জনে দুনিয়া কাঁপছে। হাতে বাঁশের লাঠি নয়—লোহার ডান্ডা।
সাবু ভাই পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়েছেন। কোথায় গেছেন কেউ জানে না! তবে কেউ কেউ তাঁকে খালি গায়ে লুঙ্গি গোছ মেরে বাতাসের গতিতে ছুটতে দেখেছেন।
তাঁকে না পেয়ে রুস্তম চাচার রাগ আরও বাড়ছে। তিনি পর্বত সাইজের শরীর নিয়ে ছোট ছোট লাফ দিচ্ছেন। সাবু ভাইকে বেরিয়ে আসতে বলছেন। মনে হয় জানেন না, আসামি বল্লাল সেনের মতো পেছনের দরজা দিয়ে খাল-বিল, নদী-নালা পেরিয়ে ভেগেছে।
আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল, যখন দূর থেকে শুনলাম সাবু ভাইয়ের নাম ছেড়ে তিনি আমার নাম ধরে চিৎকার করছেন, ‘বাদইল্যা হারামজাদা কই? পাকনা হইছে, বেশি পাকনা। আজ তারেও খাইছি। আমার নাম রুস্তম খান—আজ উস কি জান কবজ করেংগা।’
চাচা উর্দুতে বলে কী! আমার জান কবজ করবে?
সঙ্গে সঙ্গে আমার বানরভাব জাগ্রত হয়ে উঠল। দুই লাফে রাস্তা পার হয়ে চার লাফে নারকেল গাছের আগায় উঠে গেলাম।
এখানে আমাকে ধরার সাধ্য গামা পালোয়ানের নাই।
দূর থেকে চাচার বজ্রকণ্ঠ ভেসে আসছে। তাঁর মাথায় উর্দুভাষী ভূত চেপেছে, তাই ভুলভাল উর্দু আওড়াচ্ছেন, ‘আজ দোনো হারামজাদাকো জান কবজ করেংগা।’
নারকেল গাছের আগায় বসে বুঝতে পারছি না, উনি আমাদের জান কবজ করবেন কেন? সাবু ভাই তো কোনো দোষ করেননি। শুধু ভাবসম্প্রসারণ লিখে দিয়ে নিলু আপাকে সাহায্য করেছেন। আর আমি তাঁর মায়ের হাতে ওই জিনিস পৌঁছে দিয়েছি। কী করব? দরজা খুলেছিলেন খালাম্মা, নিলু আপা নয়।
আমাদের দোষটা কোথায়?


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category