জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার ঘটানোর একটি ব্যতিক্রমী ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার দ্বীপ অঞ্চল মাতারবাড়ীতে অবস্থিত বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অব্যবহৃত ও অনাবাদী জমিতে একটি ৭০ মেগাওয়াট সক্ষমতার পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল)। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা পোড়ানোর পর সংগৃহীত ছাই ফেলার জন্য রাবনাবাদ সংলগ্ন এলাকায় যে সুবিশাল জমি নির্ধারিত ছিল, তা বর্তমানে বিকল্প উপায়ে ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠায় সেখানেই এই সৌর প্যানেল বসানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। নতুন করে কোনো নতুন কৃষিজমি অধিগ্রহণ না করে এবং বিদ্যমান গ্রিড অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই উদ্যোগটি দেশের জ্বালানি খাতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করতে যাচ্ছে।
প্রস্তাবিত এই পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বাস্তবায়নে মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। প্রকল্পের প্রয়োজনীয় অর্থের সিংহভাগই আসছে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের মাধ্যমে। ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি) এই বাণিজ্যিক প্রকল্পে ৫৩২ কোটি টাকা সহজ শর্তে ঋণ হিসেবে প্রদান করবে। অবশিষ্ট আর্থিক বরাদ্দের মধ্যে ৪২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা জোগানো হবে জাতীয় রাজস্ব তহবিল বা সরকারি খাত থেকে এবং বাকি ২৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে বহন করা হবে। ডাইভারসিফাইড জ্বালানি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রস্তুত করা এই উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনাটি (ডিপিপি) ইতিমধ্যেই প্রাথমিক পর্যালোচনার জন্য জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে, যা এখন আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
মাতারবাড়ীতে বর্তমানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির একটি সুবিশাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোদমে চালু রয়েছে। কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর যে বিপুল পরিমাণ ছাই উৎপন্ন হয়, পরিকল্পনা অনুযায়ী তা নির্দিষ্ট জমিতে জমে থাকার কথা ছিল। কিন্তু আধুনিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বর্তমানে উৎপন্ন সমস্ত ছাই বাইরে বিভিন্ন সিমেন্ট কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে ছাই রাখার জন্য নির্ধারিত শত একর জমি এখন সম্পূর্ণ খালি ও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এই অব্যবহৃত পতিত জমিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক কাজে ব্যবহার করতেই ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্রিড-সংযুক্ত সৌর পার্ক নির্মাণের এই যুগান্তকারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সিপিজিসিবিএল কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নাজমুল হক সুস্পষ্ট তথ্য প্রদান করেছেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাই ফেলার ফাঁকা জায়গায় ৭০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের নীতিগত উদ্যোগ নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। প্রকল্প প্রস্তাবনাটি তৈরি করে ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনে পেশ করা হয়েছে। তবে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেক সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের পর প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ মাঠে গড়াবে।
প্রকল্পটির অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য হলো কার্বন ক্রেডিট বিক্রির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা। জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে যে পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন হ্রাস পাবে, তা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করে বৈদেশিক আয় অর্জনের স্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই জটিল প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা স্রেডার কারিগরি সহায়তায় একজন আন্তর্জাতিক মানের পরামর্শক নিয়োগের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। যদি সকল আইনি ও প্রশাসনিক অনুমোদন সঠিক সময়ে পাওয়া যায়, তবে চলতি বছরেই প্রাথমিক কাজ শুরু করে ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সিপিজিসিবিএল।
পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে উদ্যোগটির কৌশলগত সামাজিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে অব্যবহৃত সরকারি খাসজমিকে কাজে লাগিয়ে গ্রিন এনার্জি উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা হ্রাস করা। অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ না করেই বিদ্যমান মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুসংগঠিত সাব-স্টেশন, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সঞ্চালন লাইন ও অন্যান্য ভৌগোলিক অবকাঠামো সরাসরি ব্যবহার করা যাবে। ফলে সরকারের নতুন করে শত শত কোটি টাকা অবকাঠামোগত মূলধনি ব্যয় থেকে রক্ষা পাবে।
জাতীয় পর্যায়ে নবায়নযোগ্য শক্তির এই উদ্যোগটি সম্প্রতি নীতিগত গুরুত্ব লাভ করেছে। জাতীয় সংসদে গত ৮ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত মাতারবাড়ীতে ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রকাশ করেন। তবে একটি কয়লাচালিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংলগ্ন এলাকায় সৌর প্যানেল বসালে কয়লার ধূলিকণা বা বায়ুমণ্ডলীয় তাপমাত্রার কারণে সৌর প্যানেলের কার্যক্ষমতা কিংবা পরিবেশগত কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে একটি বিশদ টেকনিক্যাল পর্যালোচনা চালাতে চায় পরিকল্পনা কমিশন।
পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের বিদ্যুৎ উইংয়ের প্রধান মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম প্রকল্পটির কারিগরি দিক নিয়ে তাঁদের ভাবনার কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে ডিপিপি নথিপত্র কমিশনে এসে পৌঁছেছে এবং খুব শীঘ্রই প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেই সভায় কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অতি নিকটবর্তী স্থানে সৌর প্যানেল স্থাপনের ফলে প্যানেলের ওপর ছাইয়ের আস্তরণ জমা কিংবা স্থানীয় পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব সংক্রান্ত বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হবে। সরকার দেশে পরিচ্ছন্ন শক্তি উৎপাদনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ায় প্রকল্পটি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে, তবে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ইতিবাচক প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার একটি বিরাট অংশ প্রাকৃতিক গ্যাস, ফার্নেস ওয়েল ও আমদানিকৃত কয়লাভিত্তিক জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। এসব আন্তর্জাতিক জ্বালানি কেনাকাটা করতে গিয়ে প্রতিবছর দেশের জাতীয় কোষাগার থেকে বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে যাচ্ছে। এই অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করতে সরকার এখন বিদ্যমান বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর খালি জমিকে কাজে লাগিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কৌশল নিয়েছে। মাতারবাড়ীর প্রস্তাবিত ৭০ মেগাওয়াটের সৌর প্রকল্পটিও মূলত পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী জাতীয় শক্তি সুরক্ষার বৃহত্তর কৌশলেরই একটি অংশ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পূর্বতন সরকারের আমলে মাতারবাড়ী এলাকায় মোট ২ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সুবিশাল সমন্বিত কয়লা বিদ্যুৎ হাব গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা ছিল। প্রথম পর্যায়ে জাইকার আর্থিক সহায়তায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সফলভাবে নির্মিত হলেও দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পে অর্থায়ন স্থগিত হয়ে যায়। কারণ বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব রোধে কয়লাভিত্তিক অর্থায়ন বন্ধের জোরালো আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর জাইকা দ্বিতীয় পর্ব থেকে সরে দাঁড়ায়। সেই প্রেক্ষাপটে বর্তমানে একই জমিতে সৌরশক্তি উৎপাদনের মতো পরিবেশবান্ধব প্রকল্প গ্রহণ করা সময়োপযোগী ও টেকসই সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সামগ্রিক মূল্যায়নে দেখা যায়, কয়লা পোড়ানো ছাইয়ের জন্য বরাদ্দকৃত পড়ে থাকা ফাঁকা জমিতে হাজার হাজার সৌর প্যানেল বসানোর এই উদ্যোগ দেশের জ্বালানি খাতে এক যুগান্তকারী রূপান্তরের নজির হতে পারে। আন্তর্জাতিক ঋণ সহায়তা, বিদ্যমান সঞ্চালন অবকাঠামোর সর্বোত্তম ব্যবহার এবং কার্বন ক্রেডিট বিক্রির বৈদেশিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে প্রকল্পটি নতুন আশা তৈরি করেছে। এখন পরিবেশগত সম্ভাব্যতা যাচাই ও পিইসি সভায় কারিগরি দিকগুলো সফলভাবে উত্তীর্ণ হলে মাতারবাড়ীর এই সৌর পার্ক বাংলাদেশে সবুজ ও টেকসই জ্বালানি উৎপাদনের এক নতুন দিগন্ত সূচনা করবে।
তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা